বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে তৈরি হওয়া উষ্ণ পানির বিশাল প্রবাহ চলতি বছরে শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর প্রভাবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খরা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই সম্ভাব্য সুপার এল নিনোর মূল কারণ হলো ‘কেলভিন ওয়েভ’ নামে পরিচিত উষ্ণ পানির বিশাল ঢেউ, যা প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর অংশ দিয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কিছু এলাকায় পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি পাওয়া গেছে।
জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসনের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের বিজ্ঞানী মিশেল এল’হিউরো বলেন, বর্তমান কেলভিন ওয়েভ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কিছু ক্ষেত্রে এটি ১৯৯৭ সালের সুপার এল নিনোর সমতুল্য।
১৯৯৭-৯৮ সালের সুপার এল নিনো বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির কারণ হয়েছিল। এছাড়া ১৮৭৭-৭৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোতে লাখো মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সমুদ্র আগের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ। ফলে নতুন এল নিনো আরও তীব্র হতে পারে। এই উষ্ণতার উৎস হিসেবে ধরা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বে অবস্থিত ‘ওয়েস্ট প্যাসিফিক ওয়ার্ম পুল’ অঞ্চলকে, যা পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ সমুদ্র এলাকা।
কী প্রভাব পড়বে বিশ্বে?
কেলভিন ওয়েভের যাত্রা শেষ হলে প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাবে। এর ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিক বজ্রঝড় পূর্ব দিকে সরে গিয়ে বিশ্বজুড়ে বায়ুচাপ ও বায়ুপ্রবাহের বড় পরিবর্তন ঘটাবে। এই পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ আবহাওয়া বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ ও আর্দ্রতা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে।
কোথা থেকে আসে এত উত্তাপ?
কেলভিন ওয়েভের শক্তির মূল উৎস পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের অত্যন্ত উষ্ণ সমুদ্রাঞ্চল, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব দিকের এলাকা। ট্রেড উইন্ডসের কারণে সেখানে বিপুল পরিমাণ উষ্ণ পানি জমা হয়। দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং ধারাবাহিক লা নিনার প্রভাবে ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ তাপ সঞ্চিত হয়েছে।
যখন ট্রেড উইন্ড দুর্বল হয়ে ‘ওয়েস্টার্লি উইন্ড বার্স্ট’-এ পরিণত হয়, তখন পশ্চিম দিকের শক্তিশালী বাতাস উষ্ণ পানিকে পূর্ব দিকে ঠেলে দেয়। এতে সমুদ্রের তাপমাত্রার ভারসাম্য বদলে গিয়ে কেলভিন ওয়েভ তৈরি হয়, যা সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে কয়েক মাস ধরে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে অগ্রসর হয়।
এই ঢেউ পেরুর উপকূলে পৌঁছালে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি ওপরে ওঠার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে শক্তিশালী এল নিনো সৃষ্টি করতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৯৭ সালের পর এত শক্তিশালী পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি।
আরটিভি/এসএস




