ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

গাছের পাতায় মিলল আধুনিক শহর তৈরির গোপন নকশা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

পড়ার ঘরের টেবিলে কিংবা বারান্দার কোণে রাখা ছোট্ট একটি গাছ। টবের ভেতর গোল গোল সবুজ পাতা নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। দেখতে খুবই সাধারণ আর নিরীহ এই গাছটির নাম চাইনিজ মানি প্ল্যান্ট। তবে এই সাধারণ পাতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এমন এক জটিল গাণিতিক নকশা যা দিয়ে আধুনিক শহরের রাস্তা, স্কুল কিংবা হাসপাতালের নিখুঁত অবস্থান পরিকল্পনা করা হয়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এই অতি পরিচিত গাছের পাতায় এক বিস্ময়কর জ্যামিতিক নকশার সন্ধান পেয়েছেন। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার কমিউনিকেশনসে এই গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে যে চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের পাতার প্রধান শিরাগুলো মূলত ভোরোনয় ডায়াগ্রাম নামের একটি বিশেষ গাণিতিক বিন্যাস মেনে চলে। বিজ্ঞানীদের মতে এই আবিষ্কার কেবল উদ্ভিদবিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে না বরং ভবিষ্যতে প্রকৌশল, নগর পরিকল্পনা এবং নতুন প্রযুক্তি তৈরিতেও বড় ধরনের বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে।

সহজ ভাষায় বুঝতে গেলে ধরুন একটি বড় শহরে বেশ কয়েকটি স্কুল আছে। এখন পুরো শহরকে এমন কিছু অঞ্চলে ভাগ করা হলো যেন প্রতিটি এলাকার শিশুরা তাদের সবচেয়ে কাছের স্কুলেই সহজে যেতে পারে। অর্থাৎ কাউকে যেন অযথা দূরের কোনো স্কুলে যেতে না হয়। জায়গাকে নিখুঁতভাবে এভাবে ছোট ছোট অংশে ভাগ করার গাণিতিক পদ্ধতিকেই বলা হয় ভোরোনয় ডায়াগ্রাম। বর্তমান বিশ্বে এই একই জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করা হয় আধুনিক শহর পরিকল্পনা, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক টাওয়ারের অবস্থান নির্ধারণ, আবহাওয়া বিশ্লেষণ, রোবটের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং কম্পিউটার গ্রাফিক্সের কাজে।

গাছের পাতায় এমন মহাজাগতিক নকশা লুকিয়ে থাকার এই গল্পটি শুরু হয়েছিল বেশ দারুণভাবে। কয়েক বছর আগে গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক এলাইজা ব্লুম যখন নিজের বোনের চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের যত্ন নিচ্ছিলেন তখন হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় পাতার শিরাগুলোর দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরির এই শিক্ষানবিশ তরুণের কাছে মনে হয় পাতার এই নকশাগুলো যেন হুবহু ভোরোনয় ডায়াগ্রামের মতো দেখতে। বিষয়টি তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার তত্ত্বাবধায়ক এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী সাকেত নাভলাখাকে জানান। এরপরই শুরু হয় বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান।

smithsonian_feature
বাঁয়ে প্রাকৃতিক চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের পাতা এবং ডানে কম্পিউটারে তৈরি ভোরোনোই ডায়াগ্রামের মাধ্যমে পাতার প্রধান শিরাগুলোর নিখুঁত চিত্রায়ণ। ছবি: নাভলাখা ল্যাব

গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেন পাতার শিরা এবং হাইডাথোড নামের অতি ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলোর ভেতরের সুক্ষ্ম সম্পর্ক। হাইডাথোড হলো পাতার এমন এক বিশেষ ছিদ্র যার মাধ্যমে গাছ তার ভেতরের অতিরিক্ত পানি বাইরে বের করে দেয়। কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে গবেষকরা দেখতে পান পাতাটি যখন বড় হতে থাকে তখন অক্সিন নামের একটি উদ্ভিদ হরমোন প্রতিটি হাইডাথোড থেকে চারদিকে ঠিক ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একটি হরমোনের ঢেউ যখন অন্যটির সঙ্গে মুখোমুখি মিলিত হয় তখন তাদের মাঝখানে একটি করে সীমারেখা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এই সীমারেখাই ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় পাতার প্রধান শিরায়। অর্থাৎ পাতার শিরাগুলো কোনো পরিমাপ ছাড়াই নিজে নিজেই যেন এক ধরনের গাণিতিক মানচিত্র তৈরি করে ফেলে।

16_9_Hero
ছবি: সংগৃহীত

বহু বছর ধরেই দুনিয়ার উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ভাবছিলেন যে অনেক গাছের পাতায় এমন জালের মতো শিরার নকশা আসলে কীভাবে তৈরি হয়। নতুন এই গবেষণা সেই দীর্ঘদিনের রহস্যের একটি অত্যন্ত চমৎকার ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। গবেষকদের দাবি অনুযায়ী এটাই বিশ্বের প্রথম গবেষণা যেখানে উদ্ভিদের পাতায় কেবল ভোরোনয় ডায়াগ্রামের উপস্থিতিই শনাক্ত করা হয়নি বরং সেটি কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় তার পুরো জৈবিক প্রক্রিয়াও প্রমাণ করা হয়েছে।

উদ্ভিদের এই জটিল পাতার গঠন কেবল গাছের বেঁচে থাকার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং এটি মানুষের প্রযুক্তির দুনিয়াতেও নতুন আলো দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানী লরেন স্যাক জানান যে পাতার শিরা নিয়ে হওয়া আগের গবেষণাগুলো মানুষের তৈরি সৌর প্যানেল ও ইলেকট্রনিক সার্কিটসহ নানা ধরনের বিতরণব্যবস্থাকে আরও দক্ষভাবে নকশা করতে সাহায্য করেছে। তার মতে পাতার শিরা সম্পর্কে মানুষ যত বেশি জানতে পারবে চারপাশের প্রযুক্তিকে ঠিক ততটাই কার্যকর এবং সুন্দরভাবে তৈরি করা সম্ভব হবে।

দক্ষিণ চীনের ইউনান ও সিচুয়ান অঞ্চলের এই চিরসবুজ গাছটি আজ বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের ঘরের অন্দরের শোভা বাড়াচ্ছে। চমৎকার এই কয়েন প্ল্যান্ট বা প্যানকেক প্ল্যান্টটিই এবার বিজ্ঞানীদের নতুন করে মনে করিয়ে দিল যে প্রকৃতি কেবল চোখ জুড়ানো সুন্দরই নয় বরং তার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এক অসাধারণ গাণিতিক জাদু।

আরটিভি/এআর

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
মৃত নক্ষত্রের ছাই থেকে তৈরি হওয়া গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা
মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন একটি গ্রহ তৈরি হয়েছে—এমন সম্ভাবনার প্রথম প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। মহাবিশ্বের বুকে নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যুর চক্র অন্তহীন।
মৃত নক্ষত্রের ছাই থেকে তৈরি হওয়া গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা
মেয়ে সন্তান হলেই কি আয়ু বাড়ে বাবার? গবেষণায় মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য
সন্তান জন্মের পর বদলে যায় জীবনের অনেক হিসাব। বাড়ে দায়িত্ব, তৈরি হয় নতুন স্বপ্ন। তবে ছেলে না মেয়ে— সন্তানের লিঙ্গের সঙ্গে বাবার আয়ুর কোনো সম্পর্ক আছে কি? বিশেষ করে, কন্যাসন্তান হলে বাবার আয়ু বাড়ে— এমন ধারণার পেছনে কতটা বৈজ্ঞানিক সত্য রয়েছে?
মেয়ে সন্তান হলেই কি আয়ু বাড়ে বাবার? গবেষণায় মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য
প্রথমবার ৩ লাখ বছর আগের মানুষের মুখচ্ছবি উন্মোচন
প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার বছর আগের এক আদি মানুষের মুখচ্ছবি পুনর্গঠন করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, আধুনিক পোশাক পরিয়ে ওই মানুষকে আজকের মানুষের ভিড়ে দাঁড় করালে প্রথম দেখায় আলাদা করে চেনা কঠিন হতো।
প্রথমবার ৩ লাখ বছর আগের মানুষের মুখচ্ছবি উন্মোচন
প্রথমবার সৌরজগতের বাইরের গ্রহ থেকে সরাসরি রেডিও সংকেত শনাক্ত
পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের এখনো কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে মহাবিশ্বে আমরা একা কিনা, তা জানতে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এবার সেই অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ এক সাফল্য পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহ থেকে সরাসরি আসা রেডিও সংকেত শনাক্ত করেছেন তারা।
প্রথমবার সৌরজগতের বাইরের গ্রহ থেকে সরাসরি রেডিও সংকেত শনাক্ত
ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে বিশ্ব
প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়মিত নতুন রেকর্ড গড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে।  আবহাওয়াবিদদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছরকে ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড করা হতে পারে। শুধু তা–ই নয়, আসন্ন সুপার এল নিনো পরিস্থিতির কারণে আগামী বছরগুলোয় এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা। একিউওয়েদারের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আসন্ন সুপার এল নিনোর কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।  কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টকে ইতিহাসের উষ্ণতম আগস্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাধারণত জুলাই বছরের উষ্ণতম মাস হলেও এ বছর আগস্ট জুলাইকে ছাড়িয়ে গেছে।  একিউওয়েদারের আবহাওয়াবিদ টাইলার রয়স জানান, বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগরের সর্বত্র এই তাপমাত্রার ব্যাপক বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও বৃষ্টির ধরন সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর ঠান্ডা ও উষ্ণ দশার মধ্যে পরিবর্তিত হয়। এই উষ্ণ দশার সময় বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। মহাসাগরের এই বর্ধিত তাপশক্তি ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং চরম আবহাওয়ার সৃষ্টি করে।  যুক্তরাষ্ট্রের মেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভবিষ্যতে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে গেছে।  বিজ্ঞানীদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই জলবায়ুসংকট মানবসভ্যতার জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে। সূত্র: ডেইলি মেইল আরটিভি/এসএস
ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে বিশ্ব
আরও পড়ুন
নতুন সাজে ফ্লোরিডার ড্রাইভিং লাইসেন্স
সিলিকন ভ্যালির চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে চিপ নকশার প্রতিষ্ঠান গড়লেন এনায়েতুর 
গাছের পাতায় মিলল শহর গড়ার গাণিতিক রহস্য!
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের নকশা চূড়ান্ত