পড়ার ঘরের টেবিলে কিংবা বারান্দার কোণে রাখা ছোট্ট একটি গাছ। টবের ভেতর গোল গোল সবুজ পাতা নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। দেখতে খুবই সাধারণ আর নিরীহ এই গাছটির নাম চাইনিজ মানি প্ল্যান্ট। তবে এই সাধারণ পাতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এমন এক জটিল গাণিতিক নকশা যা দিয়ে আধুনিক শহরের রাস্তা, স্কুল কিংবা হাসপাতালের নিখুঁত অবস্থান পরিকল্পনা করা হয়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এই অতি পরিচিত গাছের পাতায় এক বিস্ময়কর জ্যামিতিক নকশার সন্ধান পেয়েছেন। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার কমিউনিকেশনসে এই গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের পাতার প্রধান শিরাগুলো মূলত ভোরোনয় ডায়াগ্রাম নামের একটি বিশেষ গাণিতিক বিন্যাস মেনে চলে। বিজ্ঞানীদের মতে এই আবিষ্কার কেবল উদ্ভিদবিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে না বরং ভবিষ্যতে প্রকৌশল, নগর পরিকল্পনা এবং নতুন প্রযুক্তি তৈরিতেও বড় ধরনের বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে।
সহজ ভাষায় বুঝতে গেলে ধরুন একটি বড় শহরে বেশ কয়েকটি স্কুল আছে। এখন পুরো শহরকে এমন কিছু অঞ্চলে ভাগ করা হলো যেন প্রতিটি এলাকার শিশুরা তাদের সবচেয়ে কাছের স্কুলেই সহজে যেতে পারে। অর্থাৎ কাউকে যেন অযথা দূরের কোনো স্কুলে যেতে না হয়। জায়গাকে নিখুঁতভাবে এভাবে ছোট ছোট অংশে ভাগ করার গাণিতিক পদ্ধতিকেই বলা হয় ভোরোনয় ডায়াগ্রাম। বর্তমান বিশ্বে এই একই জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করা হয় আধুনিক শহর পরিকল্পনা, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক টাওয়ারের অবস্থান নির্ধারণ, আবহাওয়া বিশ্লেষণ, রোবটের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং কম্পিউটার গ্রাফিক্সের কাজে।
গাছের পাতায় এমন মহাজাগতিক নকশা লুকিয়ে থাকার এই গল্পটি শুরু হয়েছিল বেশ দারুণভাবে। কয়েক বছর আগে গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক এলাইজা ব্লুম যখন নিজের বোনের চাইনিজ মানি প্ল্যান্টের যত্ন নিচ্ছিলেন তখন হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় পাতার শিরাগুলোর দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরির এই শিক্ষানবিশ তরুণের কাছে মনে হয় পাতার এই নকশাগুলো যেন হুবহু ভোরোনয় ডায়াগ্রামের মতো দেখতে। বিষয়টি তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার তত্ত্বাবধায়ক এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী সাকেত নাভলাখাকে জানান। এরপরই শুরু হয় বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান।
গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেন পাতার শিরা এবং হাইডাথোড নামের অতি ক্ষুদ্র ছিদ্রগুলোর ভেতরের সুক্ষ্ম সম্পর্ক। হাইডাথোড হলো পাতার এমন এক বিশেষ ছিদ্র যার মাধ্যমে গাছ তার ভেতরের অতিরিক্ত পানি বাইরে বের করে দেয়। কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে গবেষকরা দেখতে পান পাতাটি যখন বড় হতে থাকে তখন অক্সিন নামের একটি উদ্ভিদ হরমোন প্রতিটি হাইডাথোড থেকে চারদিকে ঠিক ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একটি হরমোনের ঢেউ যখন অন্যটির সঙ্গে মুখোমুখি মিলিত হয় তখন তাদের মাঝখানে একটি করে সীমারেখা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এই সীমারেখাই ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় পাতার প্রধান শিরায়। অর্থাৎ পাতার শিরাগুলো কোনো পরিমাপ ছাড়াই নিজে নিজেই যেন এক ধরনের গাণিতিক মানচিত্র তৈরি করে ফেলে।
বহু বছর ধরেই দুনিয়ার উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ভাবছিলেন যে অনেক গাছের পাতায় এমন জালের মতো শিরার নকশা আসলে কীভাবে তৈরি হয়। নতুন এই গবেষণা সেই দীর্ঘদিনের রহস্যের একটি অত্যন্ত চমৎকার ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। গবেষকদের দাবি অনুযায়ী এটাই বিশ্বের প্রথম গবেষণা যেখানে উদ্ভিদের পাতায় কেবল ভোরোনয় ডায়াগ্রামের উপস্থিতিই শনাক্ত করা হয়নি বরং সেটি কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় তার পুরো জৈবিক প্রক্রিয়াও প্রমাণ করা হয়েছে।
উদ্ভিদের এই জটিল পাতার গঠন কেবল গাছের বেঁচে থাকার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং এটি মানুষের প্রযুক্তির দুনিয়াতেও নতুন আলো দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানী লরেন স্যাক জানান যে পাতার শিরা নিয়ে হওয়া আগের গবেষণাগুলো মানুষের তৈরি সৌর প্যানেল ও ইলেকট্রনিক সার্কিটসহ নানা ধরনের বিতরণব্যবস্থাকে আরও দক্ষভাবে নকশা করতে সাহায্য করেছে। তার মতে পাতার শিরা সম্পর্কে মানুষ যত বেশি জানতে পারবে চারপাশের প্রযুক্তিকে ঠিক ততটাই কার্যকর এবং সুন্দরভাবে তৈরি করা সম্ভব হবে।
দক্ষিণ চীনের ইউনান ও সিচুয়ান অঞ্চলের এই চিরসবুজ গাছটি আজ বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের ঘরের অন্দরের শোভা বাড়াচ্ছে। চমৎকার এই কয়েন প্ল্যান্ট বা প্যানকেক প্ল্যান্টটিই এবার বিজ্ঞানীদের নতুন করে মনে করিয়ে দিল যে প্রকৃতি কেবল চোখ জুড়ানো সুন্দরই নয় বরং তার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এক অসাধারণ গাণিতিক জাদু।
আরটিভি/এআর




