যাদের হারাতে পারেননি সুলতান সুলেমান, সেখানেই আটকে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

আরটিভি নিউজ

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ , ০৫:০৮ পিএম


যাদের হারাতে পারেননি সুলতান সুলেমান, সেখানেই আটকে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত

একের পর এক বিস্ফোরণ, কোমর ভাঙার মতো হামলা— মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা। যে ভূখণ্ড দখলের চেষ্টায় সুলতান সুলেমানের মতো শক্তিশালী শাসকও ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেই ইতিহাসের কথাই মনে করিয়ে দেয় আজকের বাস্তবতা। তারা হার মানেনি, হারতে শেখেনি। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে ইরানকে ঘিরেই।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি হাজার বছরের ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে। একসময় শক্তিশালী পারস্য সভ্যতার কেন্দ্র ছিল এই ভূখণ্ড। ইতিহাস বলছে, ১৬০০ শতকে সুলতান সুলেমানের নেতৃত্বে উসমানীয় সাম্রাজ্য ইরানের দিকে একের পর এক অভিযান চালায়। বাগদাদসহ বেশ কিছু অঞ্চল দখল হলেও পুরো ইরান কখনোই তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

এর পেছনে ছিল কৌশলগত পরিবর্তন। সরাসরি সংঘর্ষের বদলে ইরান বেছে নেয় ভিন্ন পথ— পিছু হটা, হঠাৎ আঘাত হানা, আবার সরে যাওয়া। এই গেরিলা কৌশলই ধীর করে দেয় শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অগ্রযাত্রা।

ইরানের অদম্য মনোভাবের পেছনে ধর্মীয় ও আদর্শিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আলী (রা.)— যিনি ছিলেন সাহস, ন্যায় ও দৃঢ়তার প্রতীক। তার আদর্শ অনুসরণ করেন দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ শিয়া মুসলিম। তারা হযরত আলী (রা.)-কে ইসলামের প্রথম বৈধ ইমাম হিসেবে মানেন।

শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পর নেতৃত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিক দায়িত্বও। এখানে আলী (রা.) এবং তার বংশধরদের সত্য ও ন্যায়ের পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখা হয়।

এই বিশ্বাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিফলন দেখা যায় কারবালার যুদ্ধে। ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আত্মত্যাগ করেন। এই ঘটনা শিয়া মানসিকতায় গড়ে তোলে— অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করা, কষ্ট সহ্য করা এবং শেষ পর্যন্ত দৃঢ় থাকা।

এই মানসিকতার বড় পরীক্ষা হয়েছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধে। টানা আট বছরের সংঘাতে ব্যাপক ধ্বংস ও প্রাণহানি সত্ত্বেও ভেঙে পড়েনি ইরান। বরং সেখান থেকেই তৈরি হয়— টিকে থাকাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

বর্তমান বাস্তবতায় ইরান শুধু নিজের ভেতরেই শক্তিশালী হয়নি, বরং বদলে দিয়েছে যুদ্ধের কৌশল। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র মনে করত দূরবর্তী দেশে যুদ্ধ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা সম্ভব, নিজেদের ওপর চাপ কম রেখেই। কিন্তু সেই ধারণা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।

ইরানের কৌশল শুধু সরাসরি যুদ্ধ নয়। ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, দূরনিয়ন্ত্রিত হামলা এবং আঞ্চলিক মিত্রবলয়ের মাধ্যমে তারা এমন এক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে ইরানকে আঘাত করা মানেই একটি বিস্তৃত প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ইরান এই সংঘাতের খরচ একা বহন করে না। তাদের প্রতিক্রিয়া এমনভাবে পরিকল্পিত, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও এর মূল্য দিতে হয়। উপসাগরীয় অঞ্চল, সামরিক ঘাঁটি ও সমুদ্রপথ— সবই চলে আসে ঝুঁকির মধ্যে। ফলে সংঘাত আর দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

এই বাস্তবতা নতুন নয়। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান সরাসরি ইরাকের আল-আসাদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে স্পষ্ট হয়— ইরান শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রয়োজনে সরাসরি আঘাত করতেও প্রস্তুত।

আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে যুদ্ধের অর্থনীতিতে। যুক্তরাষ্ট্র বিপুল ব্যয়ে সামরিক শক্তি গড়ে তোলে, কিন্তু ইরান বেছে নিয়েছে ভিন্ন পথ— কম খরচে আঘাত, বেশি খরচে প্রতিরক্ষা বাধ্য করা। অর্থাৎ, একটি তুলনামূলক সস্তা আক্রমণ ঠেকাতে প্রতিপক্ষকে ব্যবহার করতে হয় অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আর এখানেই বদলে গেছে যুদ্ধের হিসাব।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission