রাত গভীর। চারপাশে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও, অসংখ্য মানুষ তখন নিঃশব্দে লড়ছে নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে। কারও চোখে ঘুম নেই। কেউ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকেও ভীষণ একা। কেউ আবার দিনের শেষে হাসিমুখে বাড়ি ফিরলেও বুকের ভেতরে জমে আছে অদৃশ্য ক্লান্তি। আর সেই অদৃশ্য যুদ্ধ নিয়েই এবার ভয়ংকর এক তথ্য সামনে এনেছে বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট।
নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে পৃথিবীতে ১২০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। সংখ্যাটা শুধু বড় নয়, ভীতিকরও। কারণ ১৯৯০ সালের তুলনায় এই হার বেড়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে উদ্বেগজনিত সমস্যা, অর্থাৎ অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, ও মারাত্মক বিষণ্নতা বা মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার। গবেষকরা বলছেন, এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে এই দুই রোগ।
তবে সবচেয়ে বেশি চিন্তার বিষয় হলো, এই চাপটা যাচ্ছে তরুণদের ওপর। বিশেষ করে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার বিস্তার সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। কিশোর বয়সের হাসি, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আড়ালে নীরবে জমছে ভয়, দুশ্চিন্তা ও একাকীত্ব।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও খাওয়াজনিত মানসিক সমস্যা বেশি। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে অটিজম, এডিএইচডি বা আচরণগত সমস্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হঠাৎ কেন এত বাড়ছে মানসিক রোগ?
গবেষকদের একজন ড. ডামিয়ান স্যান্টোমাউরো জানিয়েছেন, এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। তবে তার সহকর্মী ড. রবার্ট ট্রেস্টম্যান মনে করেন, মানুষ এখন আগের চেয়ে নিজের কষ্ট নিয়ে বেশি কথা বলছে। আগে যেসব অনুভূতি চেপে রাখা হতো, এখন সেগুলো প্রকাশ পাচ্ছে।
তবে সবাই এই ব্যাখ্যায় একমত নন। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আধুনিক সমাজে সাধারণ মানসিক চাপকেও দ্রুত রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আগে ক্লাসে অস্থির কোনো শিশুকে শুধু দুরন্ত বলা হতো। এখন খুব সহজেই তার কপালে জুড়ে যাচ্ছে এডিএইচডির তকমা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশাল ওষুধ শিল্প। অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধের বাজার এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর রোগ নির্ণয় বাড়াতে পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছে।
তবে শুধু ব্যবসা নয়, আধুনিক জীবনও যেন মানুষকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। সারাদিন স্ক্রিনে ডুবে থাকা, ঘুম কমে যাওয়া, শরীরচর্চাহীন জীবন, প্রক্রিয়াজাত খাবার, একাকীত্ব ও চারপাশের নেতিবাচক খবর সব মিলিয়ে মানুষ যেন হারিয়ে ফেলছে নিজের স্বাভাবিক ছন্দ ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়াও বড় একটি কারণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যের সাজানো জীবন দেখতে দেখতে অনেক তরুণ নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট।
আরটিভি/এআর




