২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি। ঢাকার মাটিতে সেদিন ছিল এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি আবারও ছুঁয়ে গেল বাংলাদেশের মাটি। কোকা-কোলার সৌজন্যে ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি সফরের অংশ হিসেবে আসল ট্রফিটি সেদিন ঢাকায় এসে পৌঁছায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ট্রফিটিকে নিয়ে আসা হয় রাজধানী ঢাকার রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনে। টিভির পর্দার ওপারে কিংবা বাড়ির ছাদে পতাকা উড়িয়ে এ দেশের মানুষ যে ট্রফিকে ভালোবেসেছে, তাকে এক পলক কাছ থেকে দেখার তৃষ্ণা মিটল অনেকের।
এবারের ট্রফি সফরের আমেজ ছিল ২০২২ সালের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। গতবার যেখানে ছিল সাধারণ মানুষের এক বিশাল জনজোয়ার, এবার সেখানে দেখা গেছে অনেক বেশি শৃঙ্খলা আর নিয়ন্ত্রিত আয়োজন। এবার ট্রফিটি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত না থাকলেও আভিজাত্য আর রোমাঞ্চের কোনো কমতি ছিল না। কোকা–কোলার ‘আন্ডার দ্য ক্যাপ’ ক্যাম্পেইনের বিজয়ী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরাই পেয়েছেন ট্রফির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ। নিরাপত্তার একাধিক ধাপ পেরিয়ে মানুষ ভেতরে ঢুকছিল মোবাইল ফোন হাতে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে একটি ছবি তোলাই ছিল সবার মূল লক্ষ্য।
আয়োজনে কড়াকড়ি থাকলেও ভক্তদের আবেগ ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্ধারিত সারিতে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোন হাতে সবাই অপেক্ষা করছিলেন সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের জন্য। কিউআর কোড স্ক্যান করে ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার যে ব্যস্ততা দেখা গেছে, তা বলছিল ফুটবলের প্রতি এ দেশের মানুষের টান কতটা গভীর। মাঠের সেই অনুভূতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ডিজিটাল দুনিয়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিডজুড়ে তখন ঘুরে ফিরছিল সেই সোনালি ট্রফির ছবি। কেউ শেয়ার করছেন নিজের দেখা মুহূর্ত, কেউ আবার সময় গুনছেন পরের পালার জন্য। সব মিলিয়ে পুরো দেশ যেন এক অদৃশ্য সুতোয় জড়িয়ে গিয়েছিল।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার দৃশ্য সেদিন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল র্যাডিসন হোটেলের বলরুমে। সেখানে যেমন ছিল প্রথমবার বিশ্বকাপ ট্রফি দেখার উত্তেজনায় ভরা তরুণদের ভিড়, তেমনি ছিলেন বহু বছর ধরে ফুটবলকে আপন করে নেওয়া প্রবীণ সমর্থকেরাও। জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া আর তরুণ ফুটবল তারকা শেখ মোরসালিন যখন ট্রফির পাশে দাঁড়ান, তখন মনে হচ্ছিল দেশের ফুটবলের বর্তমান মুহূর্ত আর বিশ্ব ফুটবলের চূড়ান্ত সাফল্য যেন এক জায়গায় এসে মিলেছে। কূটনীতিক, করপোরেট প্রতিনিধি, কনটেন্ট নির্মাতা, সাংবাদিক আর সাধারণ সমর্থকেরা দাঁড়িয়েছিলেন একই কাতারে। সবার পরিচয় তখন ছিল একটাই, তারা সবাই ফুটবলপ্রেমী।
ট্রফিটির সঙ্গে বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম সদস্য গিলবার্তো সিলভা। ফিফার এই দূতের উপস্থিতি পুরো আয়োজনটিকে দেয় আলাদা একটি মাত্রা। কাঁচের বাক্সে রাখা ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিলভাকে দেখে মনে হচ্ছিল, ইতিহাস যেন হঠাৎ করে খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দিনের নানা মুহূর্তে সিলভা, ট্রফি আর জামাল ভূঁইয়াদের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ব্যক্তিগত সেই আনন্দের মুহূর্তগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই রূপ নেয় জাতীয় স্মৃতিতে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই সেই রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল শহরজুড়ে। অফিসপাড়া থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের দোকান, সর্বত্র আলোচনার বিষয় ছিল একটাই। সময়টা ছিল সীমিত, কিন্তু দুপুর একটা থেকে শুরু হওয়া সেই প্রদর্শনীর প্রতিটি মুহূর্তই ছিল দামী। এই আয়োজন আবারও মনে করিয়ে দিল, ফিফা আর বাংলাদেশের ফুটবলভক্তদের সম্পর্কটা কতটা পুরোনো আর কতটা গভীর। ভিড়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল ট্রফিটাকে ঘিরে মানুষের অনুভূতি, যা ছড়িয়ে পড়েছিল কথোপকথনে আর ছবির ফ্রেমে।
রাতেই ট্রফিটি তার পরের গন্তব্যের পথে রওনা দেয়, রেখে যায় এক গভীর ছাপ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো আর কানাডায় হতে যাওয়া সেই টুর্নামেন্টের পথে এই ট্রফি সফর ঘুরবে বিশ্বের ৩০টি দেশের ৭৫টি স্থানে ১৫০ সফরদিনের বেশি সময় ধরে। এই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশের সময়টা হয়তো অল্প, কিন্তু তার আবেগের জায়গাটা ছিল অনেক বড়।
এই পরিপাটি আয়োজনের এক পাশে ছিল আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা আর নিরাপত্তা, আরেক পাশে ছিল বাংলাদেশের মানুষের চেনা ফুটবলপ্রেম। এ দেশে বিশ্বকাপ মানে শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি বহু দিনের লালিত এক অনুভূতি। জানুয়ারির সেই বিকেলে কয়েক ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশ আর ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের মাঝের দূরত্বটা যেন কমে এসেছিল। সেই সোনালি ঝলক আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ফুটবল আর বাঙালির আবেগ বহুদিন ধরেই একই সুরে গাঁথা।
আরটিভি/এসকে




