আধুনিক বিশ্বকাপ ক্রিকেট যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বৈশ্বিক অভিবাসনের এক জীবন্ত মানচিত্রে। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের স্কোয়াডে দক্ষিণ এশীয়, বিশেষ করে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারের সংখ্যা নজরকাড়াভাবে বেড়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপে অন্তত ৩০ জন ক্রিকেটার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত, যারা প্রতিনিধিত্ব করছেন বিভিন্ন দেশের হয়ে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির ১৫ সদস্যের স্কোয়াডের মধ্যে ১০ জনই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, স্কটল্যান্ড, ইতালি ও ওমানের দলেও রয়েছে পাকিস্তানি শিকড়ের একাধিক খেলোয়াড়।
এই বাস্তবতা শুধু ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬ সালের পুনে গ্র্যান্ড ট্যুর সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় লি-নিং স্টার দলের আধিপত্য কিংবা ২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের বহুজাতিক শিকড় সব মিলিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে অভিবাসী পরিচয়ের গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ক্রিকেটেও এর প্রমাণ মিলেছিল আগেই। ২০২৪–২৫ বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি চলাকালে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (এবিসি) ক্রীড়া উপস্থাপক ও সাবেক ফুটবলার পল কেনেডি জানান, অস্ট্রেলিয়ায় অনূর্ধ্ব-১২ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলা শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশই দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত। কেনেডির মতে, ভবিষ্যতে ভারতীয় বা দক্ষিণ এশীয় শিকড়ের ক্রিকেটাররাই হতে পারেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ভরসা।
বিশ্বকাপে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারদের গল্পগুলোর মধ্যেও আছে সংগ্রাম ও প্রবাসজীবনের ছাপ। আমিরাতের পেসার মুহাম্মদ জাওয়াদ উল্লাহ তার অন্যতম উদাহরণ। মালাকান্দে জন্ম নেওয়া ২৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার ২০২০ সালে পারিবারিক দায়িত্বের কারণে পাড়ি জমান আরব আমিরাতে। খোর ফাক্কানে বসবাস শুরু করে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে গিয়ে ক্রিকেটের জন্য সময় বের করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জাওয়াদ বলেন, এক-দুই ঘণ্টার বেশি সময় পেতাম না। হার্ড বল ক্রিকেট খেলতে যেখানে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা দরকার, সেখানে টেনিস বলেই খেলতে হতো।
নেদারল্যান্ডসের সাকিব জুলফিকার আবার দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি। তার বাবা জুলফিকার আহমেদ সিয়ালকোটে জন্ম নিয়ে পরে নেদারল্যান্ডসে ক্রিকেটার ও কোচ হিসেবে কাজ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় সাকিব ও তার দুই ভাই খেলছেন ডাচ জাতীয় দলের হয়ে।
জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক সিকান্দার রাজার গল্পও ব্যতিক্রমী। সিয়ালকোট থেকে জিম্বাবুয়ে এই যাত্রায় ক্রিকেট ছিল না প্রথম লক্ষ্য। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটিংয়ে ডিগ্রি অর্জন সব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটই হয়ে ওঠে তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
অন্যদিকে, আগের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে পারফরম্যান্স দিয়ে আলোচনায় উঠে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের ফাস্ট বোলার আলি খান। আসন্ন বিশ্বকাপে আবারও মুখোমুখি হবে দুই দল। যুক্তরাষ্ট্রের শায়ান জাহাঙ্গির, ইংল্যান্ডের রেহান আহমেদ ও আদিল রশিদ সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ যেন ক্রিকেটের ভাষায় আধুনিক অভিবাসনের এক অনন্য দলিল।
বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৩০ জন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার
যুক্তরাষ্ট্র: শায়ান জাহাঙ্গির, আলি খান, মোহাম্মদ মহসিন
নেদারল্যান্ডস: সাকিব জুলফিকার
জিম্বাবুয়ে: সিকান্দার রাজা
ওমান: মোহাম্মদ নাদিম, শাকিল আহমেদ, হাম্মাদ মির্জা, ওয়াসিম আলি, শাহ ফয়সাল, নাদিম খান, শফিক জান, আমির কালিম
ইংল্যান্ড: রেহান আহমেদ, আদিল রশিদ
ইতালি: জাইন আলি, আলি হাসান, সৈয়দ নাকভি
স্কটল্যান্ড: সাফিয়ান শরিফ
কানাডা: সাদ বিন জাফর
ইউএই: মুহাম্মদ ওয়াসিম, মুহাম্মদ আরফান, জুনায়েদ সিদ্দিকি, আলিশান শরাফু, হায়দার আলি, মুহাম্মদ ফারুক, মুহাম্মদ জাওয়াদ উল্লাহ, মুহাম্মদ জোহাইব, রোহিদ খান, সোহাইব খান।
আরটিভি/এসকে





