২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণের টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে হয়তো শেষবারের মতো দেখা যাবে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো দুই কিংবদন্তিকে। একইসঙ্গে এ বিশ্বকাপ হতে পারে নতুন যুগের আনুষ্ঠানিক সূচনা, যেখানে লামিন ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহাম কিংবা আর্লিং হালান্ডদের মতো তারকারা বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্র দখল করবেন।
লিওনেল মেসি
সবার আগে আলোচনায় থাকবেন লিওনেল মেসি। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর মাধ্যমে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাটি পূরণ করেছিলেন। এবারের বিশ্বকাপ মেসির জন্য আরো বিশেষ হতে পারে। কারণ এটি হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ। ৩৮ বছর বয়সী এ তারকা সম্প্রতি হ্যামস্ট্রিং সমস্যায় পড়েছেন, যা আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও থাকবেন এবারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি। ফুটবলের প্রায় সব বড় ট্রফি জিতলেও বিশ্বকাপ এখনো অধরা রয়ে গেছে তার কাছে। পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ, নেশনস লিগ—সবই আছে তার অর্জনের ঝুলিতে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও তার দখলে। কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফি ছাড়া তার ক্যারিয়ার যেন পূর্ণতা পায় না। তাই এবারের বিশ্বকাপ রোনালদোর ফুটবল জীবনের শেষ অসমাপ্ত অধ্যায়ের শেষ চেষ্টা।
কিলিয়ান এমবাপ্পে
ফুটবলের নতুন রাজপুত্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই কিলিয়ান এমবাপ্পেকে দেখা হচ্ছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয় করেছিলেন তিনি। গত কয়েক বছরে গতি, গোল করার ক্ষমতা ও বড় ম্যাচে পারফরম্যান্স দিয়ে নিজেকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবু তাকে নিয়ে আলোচনা এখনো অসম্পূর্ণ। এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে পারলে হয়তো মেসি-রোনালদোর উত্তরসূরি হিসেবে তার অবস্থান নিয়ে আর কোনো বিতর্ক থাকবে না।
ওসমান দেম্বেলে
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ফরোয়ার্ডদের একজন হতে পারেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে ইউরোপের অন্যতম প্রতিভাবান খেলোয়াড় বলা হলেও বার্সেলোনায় দীর্ঘ সময় প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। ইনজুরি ও অনিয়মিত পারফরম্যান্স তার ক্যারিয়ারকে প্রায় থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু পিএসজিতে যোগ দেয়ার পর যেন নতুন জীবন পেয়েছেন তিনি। ব্যালন ডি’অর জয়ী এ ফুটবলার বিশ্বকাপে নিজের পুনর্জন্মের গল্পকে আরও উজ্জ্বল করতে চাইবেন।
আর্লিং হালান্ড
নরওয়ের আর্লিং হালান্ড এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে যাচ্ছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও প্রিমিয়ার লিগে যেভাবে রেকর্ড ভাঙছেন, তাতে অনেকেই তাকে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকার মনে করেন। বড় টুর্নামেন্টে নিজেকে প্রমাণের জন্য তিনি মরিয়া থাকবেন।
লামিন ইয়ামাল
স্পেনের লামিন ইয়ামাল হয়তো এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ তারকা। ইউরো ২০২৪-এ মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তিনি পুরো ইউরোপকে মুগ্ধ করেছিলেন। গতি, বল নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং ও খেলার পরিপক্বতায় তাকে দেখে অনেকেই মেসির সঙ্গে তুলনা করছেন। অনেকের মতে, এমবাপ্পের চেয়েও ইয়ামালের মধ্যে ভবিষ্যৎ বিশ্বসেরা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এবারের বিশ্বকাপে তিনি যদি স্পেনকে বড় কিছু এনে দিতে পারেন এ কিশোর।
জুড বেলিংহাম
ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম আধুনিক মিডফিল্ডারের এক অসাধারণ উদাহরণ। আক্রমণ, রক্ষণ, পাসিং, নেতৃত্ব—সবকিছুতেই তার উপস্থিতি স্পষ্ট। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েই তিনি ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও লা লিগা জেতাতে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বড় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন এবারও ইংল্যান্ড দেখছে, আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে থাকবেন বেলিংহাম।
নেইমার
ব্রাজিলের নেইমারকে ঘিরে আলোচনা কখনোই কেবল ফুটবল নিয়ে নয়; বরং প্রত্যাশা ও অপূর্ণতার গল্পও। ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এখনো দেশকে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেননি। ইনজুরি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল নতুনভাবে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে। হয়তো এটি নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ। তাই পুরো ব্রাজিল তাকিয়ে থাকবে, তিনি কি শেষবারের মতো জাদু দেখাতে পারেন?
মোহাম্মদ সালাহ
আফ্রিকান ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতীকগুলোর একটি। লিভারপুলে অসাধারণ সময় কাটিয়ে তিনি ক্লাব ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও প্রিমিয়ার লিগ জয়ের পাশাপাশি শত শত গোল করেছেন তিনি। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা এখনো জেতেননি। এবার মিসরের আশা থাকবে, ৩৩ বছর বয়সী সালাহ তার সেরা ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে উপহার দেবেন।
ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ
স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভরসা ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ। ছোটবেলা থেকেই তাকে আমেরিকান ফুটবলের ভবিষ্যৎ বলা হতো। ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে খেলে সেই সম্ভাবনার প্রমাণও দিয়েছেন তিনি। মরিসিও পচেত্তিনোর অধীনে দলটি যদি ভালো কিছু করতে চায়, তবে পুলিসিচকে সেরাটা দিতেই হবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই বিদায়ের আবেগ, উত্তরাধিকারের লড়াই এবং নতুন তারকার জন্ম দেখার মঞ্চ। মেসি-রোনালদোর যুগ শেষ হওয়ার পথে, কিন্তু ফুটবল কখনো শূন্য থাকে না। নতুন প্রজন্ম প্রস্তুত হচ্ছে নিজেদের সময় শুরু করার জন্য। আর সেই গল্পের সাক্ষী হবে গোটা বিশ্ব।
আরটিভি/এমএম


