হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো জীবন ওদের

আরটিভি নিউজ

সোমবার, ১১ মে ২০২৬ , ১০:৫৯ এএম


হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো জীবন ওদের
প্রতীকী ছবি

রাতুলের বয়স দশ বছর। এই বয়সেই নিজে আয় করে চলতে হয় রাতুলকে। রাজধানীর ধানমন্ডি লেক এলাকায় ‘হাওয়াই মিঠাই’ বিক্রি করে জীবন চালায় দেখতে ফুটফুটে চেহারার ছেলেটি। পাশাপাশি বিকেল বেলা পথশিশুদের একটি বিদ্যালয়ে পড়ে। শুধু রাতুলই নয়, ধানমন্ডি লেক এলাকায় এমন অনেক দুর্ভাগাকে শিশু বয়সেই নিজের উপার্জনে চলতে হয়। অনেককে আবার এই উপার্জন থেকে সাশ্রয় করে বাড়ির জন্যও টাকা পাঠাতে হয়। এদের ‘হাওয়াই মিঠাই’ জীবনের গল্প প্রায় একই রকম।

গত সপ্তাহে দেখা হয় রাতুলের সঙ্গে। হাতে একটি লোহার পাইপে করে হাওয়াই মিঠাই নিয়ে বেরিয়েছে। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা একটা সবুজ পাঞ্জাবি। কচি মুখে সরলতা মাখানো, তবে হাসি নেই সেখানে।

রাতুলের বাড়ি বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলায়। তবে গৌরনদীর কোথায় সেটা বলতে পারে না। ছোট বেলায়ই মাকে ছেড়ে রাতুলের বাবা চলে গেছে। এরপর মা মারা যান। গরীব নানির কাছে মানুষ। দু-মুঠো খেতেও পেত না। তাই আট বছর বয়সেই ঢাকায় পাড়ি জমায়। এখন হাওয়াই মিঠাই বিক্রেতা। একেকটার দাম দশ টাকা।

কথা বলতে কোনো প্রকার অস্বস্তি নেই রাতুলের। আপন মনেই বলতে থাকে, বিকেল বেলায় ধানমন্ডি লেকেই হাওয়াই মিঠাই তৈরিকারী এক ব্যক্তির কাছ থেকে সে নিজে এবং আরও কয়েক শিশু সেগুলো বাকিতে কিনে নেয়। বিক্রির পর দাম শোধ করে ওরা। যতক্ষণ বিক্রি না হয়, যত রাতই হোক, ওরা সাধারণত ফেরে না। এভাবে দিনে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে রাতুল। এতে ১৫০-২০০ টাকা আয় হয়। এ দিয়ে নিজের থাকা-খাওয়া চলে। থাকে রবীন্দ্র সরোবরে খোলা জায়গায়। এখানেই একটি বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে রাতুল।

রাতুল বলে, মাঝে-মধ্যে নানির কাছে যেতে মন চায়। কিন্তু সব সময় যেতে পারে না। হাওয়াই মিঠাই বিক্রির টাকা যে, নিজের থাকা-খাওয়াতেই শেষ হয়ে যায়।

ধানমন্ডি লেক এলাকায় কথা হয় চায়ের ফেরিওয়ালা মো. শাকিব (১২) ও বাদাম বিক্রেতা ওয়ালীউল্লাহর (১৩) সঙ্গে।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলায় বাড়ি শাকিবের। ওয়ালীর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে। শাকিব এখানে এসেছে কয়েক মাস হলো। ওয়ালীউল্লাহ এক বছরের বেশি সময় ধরে।
 
শাকিব জানায়, তারা ছয় ভাই, এক বোন। বাবা কামলা দেন। বাড়িতে ঠিকমতো খেতে পেত না। অন্যদের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হতো। এ নিয়ে বাবা-মা বকতেন। তাই বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে।

আরও পড়ুন

বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চা বিক্রি করে দিনে প্রায় পাঁচশ’ টাকা আয় করা শাকিব থাকে মোহাম্মদপুরে। এক রুমে থাকে কয়েকজন। এখন মাসে বাড়িতে হাজার পাঁচেক করে টাকাও পাঠাতে পারে শাকিব। তবে বিদ্যালয়ে যায় না।

বাদাম বিক্রেতা ওয়ালীউল্লাহ জানায়, সাতজনের পরিবার ওদের। গরীব বাবার সংসারে যথারীতি অভাবের শেষ নেই। বাধ্য হয়ে বছর খানেক আগে এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ঢাকায় আসা। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে ওয়ালীউল্লাহ। এখন আর পড়ে না। শুক্রাবাদে একটি রুমে গাদাগাদি করে নয়জন থাকে।

ওয়ালীউল্লাহ বলে, একটু হিসেব করে চলার কারণে মাসে ৭-৮ হাজার করে টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারে। দিনে আয় ৭০০-৮০০ টাকা। মাঝে মাঝে বাড়ি যাওয়ার প্রবল ইচ্ছে জাগলেও যেতে পারে না।

কথা হয় লেক এলাকার দর্শনার্থী ও সাংবাদিক রাকিব মোজাহিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, হাওয়াই মিঠাইয়ের মতোই জীবন এদের। সামান্য বাতাসেই মিইয়ে যায় ওরা। ওদের জন্য সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

এ বিষয়ে শিশু অধিকার কর্মী আব্দুস শহীদ মাহমুদ বলেন, এসব শিশু এত কষ্ট করে রোজগার করে নিজের জীবিকা চালায় এবং পরিবারের জন্য টাকা পাঠায় সেটা ইতিবাচক। তবে এই বয়সে তো তাদের এ কাজ করার কথা নয়। এ সময় তাদের পড়ালেখা ও সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকার কথা। তাই সরকারের উচিত এসব শিশুর বিষয়ে কিছু করা। প্রয়োজনে যথাযথ তদারকির ব্যবস্থা রেখে বেসরকারি সংস্থাকেও এসব শিশুর উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

সূত্র: বাসস

আরটিভি/আইএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission