ডেঙ্গু প্রতিরোধ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ হিসেবে পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম।
সোমবার (২৯ জুন) নগরভবনে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন ও নগরবাসী যদি নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তাহলে আগামী দুই বছরের মধ্যেই রাজধানীতে দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, বিশ্বের দূষিত শহর, যানজট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নেতিবাচক সূচকে ঢাকার অবস্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাজধানীকে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও নাগরিকবান্ধব শহরে রূপান্তর করতে সিটি কর্পোরেশনকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক আরও বলেন, একটি শহরকে বদলে দিতে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদেরও সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। তার ভাষায়, আমি সবসময় বলি ৫০ শতাংশ দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের, আর ৫০ শতাংশ দায়িত্ব জনগণের। এই দুই পক্ষ যদি শতভাগ দায়িত্ব পালন করে, তাহলে ঢাকাকে বদলে দেওয়া সম্ভব।
আব্দুস সালাম বলেন, একটি আধুনিক নগরের মৌলিক সেবাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা। কোথাও স্ট্রিট লাইট ১৫ দিন, এক মাস কিংবা তারও বেশি সময় ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতি সহ্য করা হবে না।
তিনি জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা যদি নিয়মিত ও সঠিকভাবে কাজ করেন, তাহলে নগরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন নয়। তবে এ ক্ষেত্রে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকার জন্যও নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থান রয়েছে। এসব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করলে রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব।
আব্দুস সালাম বলেন, ঢাকার বহু খাল বছরের পর বছর ধরে দখল, ভরাট এবং অব্যবস্থাপনার কারণে সংকুচিত হয়ে গেছে। অনেক খালের প্রস্থ ৪০ থেকে ৫০ ফুট থেকে কমে মাত্র ১০ থেকে ১৫ ফুটে নেমে এসেছে। আবার অনেক খাল প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্যে ভরে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিয়মিত খাল পরিষ্কার না হওয়া এবং ড্রেনগুলো বর্জ্যে আটকে থাকার কারণেই সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায় এবং নগরজীবন অচল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে দ্রুত সমাধান সম্ভব, সেখানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে বৃষ্টির পানি সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আবদুস সালাম জানান, বর্তমানে রাজধানীতে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন করিডোর নেই। প্রয়োজন অন্তত ২০ থেকে ৩০টি নতুন নিষ্কাশন পথ। সরকারের সহযোগিতায় চলতি বছর অন্তত দুটি নতুন সংযোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। এগুলো চালু হলে আগামী বছর থেকে জলাবদ্ধতার স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, এবার মৌসুম শুরুর আগেই দক্ষিণ সিটির প্রতিটি ওয়ার্ডে বিশেষ জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। সেই জরিপে প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নাগরিকদের নিজেদের বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা অন্য যেকোনো স্থানে দুই থেকে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।
প্রশাসক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে অসুস্থ হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক বেশি কার্যকর। এ লক্ষ্যেই প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আব্দুস সালাম বলেন, ওই দিন নগরবাসীকে নিজ নিজ বাড়ি, ছাদ, আঙিনা, রাস্তার সামনের অংশ এবং আশপাশের এলাকা পরিষ্কার করার আহ্বান জানানো হবে। কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি মসজিদের ইমাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে।
তিনি বলেন, শুধু হোল্ডিং ট্যাক্স বা কর আদায়ের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নতুন নতুন রাজস্ব উৎস তৈরি করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে নাগরিকদের নিয়মিত কর পরিশোধ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং বকেয়া রাজস্ব পরিশোধের আহ্বান জানান তিনি। এতে সিটি করপোরেশনের সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।
আব্দুস সালাম বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ ঢাকায় আসছে। ফলে নগর ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফুটপাত অবশ্যই পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। তবে জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এজন্য হকারদের জন্য একটি মানবিক, পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি জানান, সরকার এ বিষয়ে মানবিক অবস্থানে রয়েছে। তাই কাউকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ নয়, বরং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই রাজধানী গড়ে তুলতে প্রশাসনের একার পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব নয়। নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এবং সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর সেবার সমন্বয়েই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু রাস্তা পরিষ্কার করা নয়। আমরা এমন একটি ঢাকা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে মানুষ স্বস্তিতে বসবাস করবে, নিরাপদ পরিবেশ পাবে এবং নিজেদের শহর নিয়ে গর্ব করতে পারবে। সবাই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করি, তাহলে আগামী দুই বছরের মধ্যেই আমরা একটি পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও উন্নত ঢাকার বাস্তব চিত্র দেখতে পাব। সূত্র: বাসস
আরটিভি/টিআর




