জালে মাছ নেই, মুখে হাসি নেই ঈদে

কুয়াকাটা প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬ , ০৩:১৯ পিএম


জালে মাছ নেই, মুখে হাসি নেই ঈদে
ছবি: প্রতিনিধি

ভোরের আলো ফুটতেই সমুদ্রের দিকে বেরিয়ে যায় ছোট ছোট মাছধরা ট্রলার। প্রতিদিনের মতো জীবিকার আশায় জেলেরা পাড়ি জমান গভীর সাগরে। কিন্তু সেই সাগরই যেন এখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে উপকূলের জেলেদের কাছ থেকে।

বিজ্ঞাপন

প্রায় ৩০ হাজার নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত জেলে পরিবার রয়েছে কুয়াকাটার উপকূলীয় অঞ্চলে। গত তিন মাস ধরে সমুদ্রে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না মাছ। যার ফলে ঈদের আনন্দ উদযাপনে দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করছেন এই পরিবারগুলো।  

উপকূলের জেলেদের প্রধান পেশা মাছ ধরা। বছরের বেশিরভাগ সময় তারা সমুদ্রে গিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সাগরে মাছের সংকট দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন

জেলেরা জানান, আগে একদিন সাগরে গেলে ভালো পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত। এখন তিন-চার দিন জাল ফেলেও ফিরতে হচ্ছে প্রায় খালি হাতে। এতে করে বাড়ছে লোকসান, আর কমছে সংসারের আয়। অনেক জেলে এখন সাগরে যেতে সাহস পাচ্ছেন না, কারণ তেলের খরচ আর শ্রমের তুলনায় মাছ পাওয়া যাচ্ছে খুবই অল্প।

স্থানীয় জেলে আব্দুল করিম বলেন, আগে একদিন সাগরে গেলে ভালো পরিমাণ মাছ নিয়ে ফিরতাম। এখন তিন-চার দিন গিয়েও জালে তেমন কিছু থাকে না। সামনে ঈদ, কিন্তু সংসার চালানোই কষ্ট হয়ে গেছে। 

বিজ্ঞাপন

ঈদকে ঘিরে সাধারণত জেলে পাড়ায় থাকে অন্যরকম ব্যস্ততা। নতুন কাপড় কেনা, ঘর সাজানো কিংবা পরিবারের জন্য ভালো খাবারের প্রস্তুতি-সবকিছু নিয়েই থাকে আনন্দের আমেজ। কিন্তু এবার সেই দৃশ্য নেই।

জেলে পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, অনেকেই বসে জাল সেলাই করছেন। কেউবা নৌকা মেরামত করছেন। কিন্তু সবারই চোখেমুখে হতাশা। কারণ মাছ না থাকলে জেলের জীবনে আয়ের আর কোনো পথ নেই।
জেলে পরিবারের সদস্য রাশেদা বেগম বলেন, বাচ্চারা ঈদের নতুন কাপড় চায়। কিন্তু হাতে টাকা নেই। মাছ না পেলে তো আমাদের চলাই মুশকিল। 

মাছের সংকট শুধু জেলেদের জীবনেই প্রভাব ফেলছে না। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মাছের বাজার ও আড়তগুলোতেও। আগে যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাছ নিয়ে ফিরতেন জেলেরা এখন সেখানে দেখা যায় খালি ঝুড়ি আর অপেক্ষার প্রহর। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার, শ্রমিকসহ এই পেশার সঙ্গে জড়িত অনেক মানুষ। অনেক আড়তে এখন কাজ কমে গেছে।

রাজু আহমেদ আলীপুর মৎস্য আড়তের শ্রমিক। কথা হয় তার সাথে, তিনি বলেন, ঘাটে মাছ আসলে আমাদের আয় হয়। মাছ নাই তো ইনকাম বন্ধ। এ বছর ঈদ হবে না। 

স্থানীয় জেলেদের মতে, সমুদ্রে মাছ কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। আবহাওয়ার পরিবর্তন, সাগরে বড় ট্রলারের আধিপত্য এবং অবৈধ জালের ব্যবহারকে তারা দায়ী করছেন।

তাদের দাবি, বড় ট্রলারগুলো গভীর সাগরে ব্যাপকভাবে মাছ ধরছে। পাশাপাশি কিছু অসাধু জেলে অবৈধ জাল ব্যবহার করায় ছোট মাছও ধরা পড়ছে। ফলে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এতে করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন ছোট ট্রলারের জেলেরা।

স্থানীয় মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। জেলেদের সহায়তায় সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলেও জানান তারা। তবে জেলেদের দাবি, অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা, সাগরে বড় ট্রলারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে জেলে পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হলে সংকট কিছুটা কমতে পারে।

সাগরপাড়ের মানুষের কাছে মাছ শুধু জীবিকার উৎস নয়, আশা আর স্বপ্নের প্রতীক। কিন্তু সেই স্বপ্ন যখন জালের ফাঁক গলে হারিয়ে যায়, তখন উৎসবের আনন্দও মলিন হয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, সমুদ্রে জেলেদের জালে মাছ ধরা পড়ে আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় মাছ ধরা পড়েছে না। এ জন্য জেলে পল্লীতে কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছেন। দ্রুত জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য সহায়তার চাল বিতরণ করা হবে।

সামনে ঈদুল ফিতর। কিন্তু কুয়াকাটার জেলে পাড়ায় এখন নেই উৎসবের প্রস্তুতির কোলাহল। বরং রয়েছে অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার দীর্ঘশ্বাস।

বিশাল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সব জেলেদের একটাই আশা, জাল আবার ভরে উঠুক মাছের ঝিলিকে; আবার ফিরে আসুক উপকূলের মানুষের হারিয়ে যাওয়া হাসি।

আরটিভি/এমআই

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission