ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলা সদর বাজারের পাশের একটি জলাশয়ের তীরজুড়ে অবাধে বিচরণ করছে বিশালাকৃতির বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী গুইসাপ। এই এলাকায় এখন প্রায় দুই শতাধিক গুইসাপের বসবাস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়দের কাছে বাজারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে এগুলো।
সোমবার (২০ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, বাজার সংলগ্ন খালের তীরজুড়ে সারাদিন দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশালাকৃতির গুইসাপগুলো। বাজারের দোকান থেকে ফেলে দেওয়া পচা মাছ, মরা মুরগি, এমনকি জবাই করা গরুর হাড় ও ভুঁড়িই তাদের প্রধান খাদ্য।
বাজারের ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমকে জানান, গুইসাপগুলো মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। বরং বাজারে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ কারণে এখন আর কেউ তাদের তাড়িয়ে দেয় না, বরং নিরাপদে বসবাস করতে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা গণমাধ্যমকে জানান, মাঝে মধ্যে গুইসাপগুলো আশপাশের বাড়ির উঠানেও চলে যায়। তবে এগুলো সম্পূর্ণ নিরীহ হওয়ায় কারও মধ্যে তেমন ভয়ের সৃষ্টি করে না। এলাকাবাসী তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে।
সদরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সব্যসাচী মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, গুইসাপ মানুষের জন্য ক্ষতিকর না। এদের সাপের মতো বিষ নেই।
পরিবেশবিদদের মতে, এমন প্রাণীর উপস্থিতি একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রেরই ইঙ্গিত বহন করে। তাই এই গুইসাপগুলোকে রক্ষা করা এবং তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
উপকারী প্রাণী গুইসাপের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্য সদরপুরের মানুষের প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জোহরা মিলা। তিনি জানান, বাংলাদেশে তিন ধরনের গুইসাপের দেখা মেলে। এর মধ্যে রামগদি বা কালো গুই আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গুইসাপ। এটি দৈর্ঘ্যে ৭ থেকে ৯ ফুট এবং ওজন ২৫ কেজিরও বেশি হতে পারে। এদের আলাদা করা কিছুটা কঠিন, তাই সব কটি প্রজাতিই মানুষের কাছে গুইসাপ নামে পরিচিত। এই প্রাণীটি এলাকাভেদে তারবেল, গুইল, ঘোড়েল ইত্যাদি নামেও পরিচিত।
তিনি বলেন, গুইসাপ শান্ত স্বভাবের প্রাণী। এরা সাধারণত মাটির গর্ত, গাছের কোটর, পুরোনো দেয়ালের ফাটল কিংবা পরিত্যক্ত ইটভাটায় বাস করে। প্রাণীটি দিবাচর, তাই দিনে শিকার করে এবং রাতে বিশ্রাম নেয়। সাধারণত বিষধর সাপ ও সাপের ডিম, মৃত মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক এবং পচা-গলা প্রাণী খায়। তবে ধানক্ষেতের ইঁদুর ও ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে বলে গুইসাপকে ‘কৃষকের বন্ধু’ও বলা হয়। এরা দ্রুত গাছে উঠতে পারে এবং সাঁতারেও অত্যন্ত দক্ষ। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জলাভূমির আশপাশে এদের আবাসস্থল দেখা যায়।
গুইসাপ অত্যন্ত উপকারী প্রাণী; কিন্তু মানুষ অকারণেই এর সঙ্গে শত্রুতা করে—এমন মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, গুইসাপের সংখ্যা কমে যাওয়া মানুষের জন্য ভালো কিছু নয়। প্রাণীটি কমে গেলে পরিবেশে ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় বাড়বে, ইঁদুরের উৎপাত বাড়বে এবং বিষাক্ত সাপের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া পচা-গলা প্রাণিদেহ খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়া থেকেও রক্ষা করে। তাই গুইসাপের ক্রমহ্রাসমান অবস্থার কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রোগজীবাণুর ঝুঁকির মধ্যেও পড়ছে।
মিলা জানান, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) গুইসাপের তিনটি প্রজাতির মধ্যে রামগদি বা কালো গুইকে ‘সংকটাপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ১৯৯০ সালে গুইসাপ হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী গুইসাপ সংরক্ষিত প্রাণী। তাই এটি হত্যা, শিকার বা কোনো ধরনের ক্ষতি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আরটিভি/এমএইচজে




