শিল্প-কারখানাসমৃদ্ধ নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলা। এই শহরে ভারী, হালকা ও ক্ষুদ্র কল-কারখানা রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে পণ্য উৎপাদন ও সেগুলোর বাজারজাতকরণ। কিন্তু চরম লোডশেডিংয়ের কারণে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ মিলছে অর্ধেকেরও কম। ফলে বিদ্যুৎ স্বল্পতায় বন্ধ হতে শুরু করেছে এখানকার কিছু ভারী ও হালকা শিল্প-কারখানা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইকু পেপার মিল, পাটের চট, অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র তৈরির কারখানাসহ শতাধিক হালকা মেশিনারিজ ওয়ার্কশপের মেশিন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে মাঝপথে উৎপাদন থেমে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। শ্রমিকরাও অলস বসে অপেক্ষা করছেন কখন বিদ্যুৎ আসবে।
সূত্র বলছে, সৈয়দপুর শহরের দেড় হাজার কলকারখানার বিপরীতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ প্রয়োজন প্রায় ২০ মেগাওয়াট। অথচ নেসকোর অধীনে প্রতিদিন বিদ্যুতের মোট চাহিদা ৪৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে মিলছে মাত্র ২৬ মেগাওয়াট। তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে শিল্প-কারখানার মেশিনগুলো চালু অবস্থায় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো চালু আছে সেগুলোরও উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে, তেমনি বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ক্ষতি হচ্ছে।
ইকু গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক বলেন, এই মুহূর্তে লোডশেডিং বৈশ্বিক সমস্যা। এটা মেনে নিলেও শিল্প-প্রতিষ্ঠানে নিয়ম করে লোডশেডিং করলে উৎপাদন নিয়মিত থাকবে এবং যন্ত্রাংশের ক্ষতি হবে না।
নোয়াহ্ রয়েল রিল্যাক্স মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজু পোদ্দার বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারছি না। যদি একটি নির্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ না থাকে তাহলে আমরা আমাদের উৎপাদনের সময়সূচি পরিবর্তন করব। এতে উৎপাদন কম হলেও নির্বিঘ্নে আমরা নির্দিষ্ট একটি সময় বিদ্যুৎ পাব। অনেক শ্রমিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল; যত উৎপাদন করতে পারবে তাদের মজুরি তত বাড়বে। বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন যেমন কমেছে, তেমনি শ্রমিকদের মজুরিও কমেছে।
মঈন ওয়ার্কশপের মালিক মঈন উদ্দিন বলেন, বারবার লোডশেডিং হলে কাজের গতি কমে যায়। অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে লোকসান গুনতে হয়।
মো. আলাউদ্দিন নামে একজন শ্রমিক বলেন, আমরা দিনমজুরিতে কাজ করি। বিদ্যুৎ না থাকলে কাজ বন্ধ থাকে, এতে মজুরিও কমে যায়।
স্বপ্ন রায় নামে একজন শ্রমিক বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আয়-রোজগার কমে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন বন্ধ থাকে, এভাবে চললে আমরা বেকার হয়ে যাব। মালিক কারখানা বন্ধ করার চিন্তা করছেন।
বিসিক শিল্প নগরীর কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, বিসিকে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৭ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ পাই মাত্র ৩ ঘণ্টা। এভাবে চলতে থাকলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে এবং সরকার রাজস্ব হারাবে।
সৈয়দপুর উপজেলা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলিমুল ইসলাম সেলিম বলেন, চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পেয়েও সাধ্যমতো চেষ্টা করছি শিল্প-কারখানাগুলোতে লোডশেডিং কম করতে। সৈয়দপুরের শিল্প-কারখানায় রেলওয়ের কোচ সংস্কার, সিরামিক ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্য, পাটের চট, কাগজ, প্লাইউড, কৃষিজাত মেশিনারিজের যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরি হয়। এসব কারখানায় কাজ করেন হাজারো শ্রমিক। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে অনেকে চাকরি হারাবে এবং বেকারত্বের সংখ্যা বাড়বে।
আরটিভি/এমএইচজে



