নড়াইল জেলার সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোতে এখন থরে থরে সাজানো রয়েছে হাজার হাজার বই। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, রাজনীতি, শিশুতোষ কিংবা জীবনী জ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যার সন্ধান মিলবে না এখানকার লাইব্রেরিগুলোতে। বছরের পর বছর ধরে যত্ন করে রাখা হয়েছে অনেক দামি ও পুরাতন মূল্যবান বই। কিন্তু যাদের জন্য এই বিশাল আয়োজন, সেই পাঠকদেরই দেখা মিলছে না। এক সময়ের জ্ঞানপিপাসুদের কোলাহলে মুখরিত লাইব্রেরিগুলো এখন যেন এক একটি নিঃসঙ্গ নীরবতার প্রতীক।
নড়াইল জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারে একই সাথে বসে দুই শতাধিক পাঠকের বই পড়ার মনোরম পরিবেশ ও সুব্যবস্থা রয়েছে। পাঠকদের সুবিধার্থে এখানে রয়েছে আলাদা পুরুষ কর্নার, নারী কর্নার, জব কর্নার এবং পত্রিকা কর্নার। আলমারিগুলোতে থরে থরে সাজানো আছে প্রায় ৪০ হাজার বই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল অবধি লাইব্রেরি খোলা থাকলেও, গড়ে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ জনের বেশি পাঠক এখানে আসেন না।
গ্রন্থাগারের শিশু কর্নারটিতে এখনো স্কুলের ফাঁকে সামান্য কয়েকজন ক্ষুদে শিক্ষার্থী আসে। সেখানে হাতেগোনা তিন-চারজন শিশুকে খেলাধুলা ও গল্পের বই পড়ে সময় কাটাতে দেখা যায়। তবে মূল হলরুমের পাঠকক্ষটি প্রায় সময়ই ফাঁকা পড়ে থাকে। জেলার প্রায় ২০ থেকে ২২টি সরকারি-বেসরকারি গ্রন্থাগারের প্রতিটিতেই এখন একই করুণ চিত্র।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিকতার যুগে মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত দৌরাত্ম্যের কারণে বই পড়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। এক সময় লাইব্রেরিগুলোতে বসার জায়গার বা চেয়ার-টেবিলের অভাবে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত। আর এখন পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও পাঠকের দেখা মিলছে না। মানুষের চোখ এখন বইয়ের পৃষ্ঠার চেয়ে ডিজিটাল স্ক্রিনেই বেশি আটকে থাকে। ফলে বইয়ের পাতা খুলে জ্ঞানের আলো খোঁজার ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সেমিনার, পাঠচক্র ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, বিভিন্ন উৎসব ও আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য লাইব্রেরি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রন্থাগারগুলোকে আরও আকর্ষণীয় ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
আব্দুল হাই ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান মল্লিক বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের নতুন প্রজন্মকে বইয়ের পাতা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এক সময় শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্ঞানচর্চা করত, যা তাদের চিন্তাভুবনকে সমৃদ্ধ করত। এখন স্ক্রিন-নির্ভরতার কারণে তরুণদের গভীর মনোযোগ ও সৃজনশীলতা লোপ পাচ্ছে। গ্রন্থাগারগুলোকে শুধু বইয়ের ঘর বানিয়ে রাখলে চলবে না, এগুলোকে সচল করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে যৌথ ভূমিকা নিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে অন্তত একটি লাইব্রেরি ক্লাস বাধ্যতামূলক করা এবং তরুণদের রুচি অনুযায়ী নতুন বইয়ের সংগ্রহ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
জেলা প্রশাসক ড. আব্দুল ছালাম বলেন, লাইব্রেরিগুলোতে পাঠক ফেরাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পর্যায়ের ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও উৎসবের মাধ্যমে আবার বইমুখী করার পরিকল্পনা আমাদের।
আরটিভি/ এসকেডি




