আসন্ন জাতীয় বাজেট নিয়ে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার চার তরুণ তাদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, কেবল বড় অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না; সেই বাজেটের সুফল প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে সহায়তা দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে তরুণদের জন্যও সৃষ্টি হবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার বলেও জানান তারা।
যুব সংগঠক ও সামাজিক উদ্যোক্তা আরাফাত হোসাইন মিরাজ জানান, বর্তমানে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা দিন দিন বাড়ছে। তাই শুধু সরকারি বা বেসরকারি চাকরির ওপর নির্ভর না করে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মঠবাড়িয়া ই-বাজারের মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, সামান্য প্রশিক্ষণ, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ পেলে গ্রামের অনেক তরুণ-তরুণী সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন। কিন্তু জামানতের জটিলতা, উচ্চ সুদ এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়। তাই আগামী দিনে স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতমুক্ত স্বল্পসুদে ঋণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিল এবং উপজেলা পর্যায়ে বিজনেস সাপোর্ট সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
শিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার জন্য বিশেষ সহায়তা থাকলে তারা শুধু চাকরি খুঁজবেন না, বরং নিজেরাও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন। পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল ব্র্যান্ডিংয়ে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো হলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিও বাজেটে আরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল।
অর্থনীতিতে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্ত করা শিমু আক্তার জানান, জাতীয় বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর মূল চাবিকাঠি। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধরনের বাজেট প্রকাশ করা হয় ২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এটা ৫৫ তম বাজেট। এবারের বাজেটের স্লোগান ছিল, গণতান্ত্রিক মানবিক অন্তর্ভুক্তিমুলক অর্থনীতির অভিযাত্রা। একজন সাধারন মানুষ হিসেবে আমি মনে করি এবারের বাজেট প্রশংসনীয় তবে বাজেট কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয় তার যথাযথ ব্যবহারিক একটি দেশের উন্নয়ন সুনির্দিষ্ট করে। একটি দেশের উন্নয়ন তৃণমূল পর্যায়ে থেকে শুরু হয় তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ে বাজেট হল বৈষম্য দূরীকরণ উন্নয়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং তাদেরকে স্বনির্ভর করার মূল হাতিয়ার। একটি দেশের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যতক্ষণ পর্যন্ত জীবনযাত্রার মান উন্নত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই দেশ বা রাষ্ট্রের উন্নতি অকল্পনীয়। আমাদের দেশের প্রান্তিক মানুষের অধিকাংশই কৃষিজীবী এবারের ২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ক্ষেত্রে বাজেট ধরা হয়েছে ২৮৮২০ কোটি টাকা, কিন্তু এই টাকা সরাসরি প্রতিটি উপজেলার ইউ এন ও এর মাধ্যমে আবেদনের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো উচিত।
নারী উদ্যোক্তা হীরা শ্রাবণী বুশরা বলেন, এবারের জাতীয় বাজেট আকারে বড় হলেও সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা খুব একটা নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। উন্নয়ন প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোই হওয়া উচিত বাজেটের প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ফ্রিল্যান্সিং এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া তরুণদের জন্য ইতিবাচক দিক। তবে এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।
শিক্ষিত বেকারদের জন্য তিনি বেকারত্ব ভাতা চালু এবং সরকারি চাকরির আবেদন ফি কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানান। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তির শর্ত সহজ করা, কাগজপত্রের জটিলতা কমানো এবং প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আগামী বাজেটে তিনি তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান—বিনা জামানতে সহজ শর্তে উদ্যোক্তা ঋণ, প্রতিটি ইউনিয়নে ফ্রি কম্পিউটার ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধাসহ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে আরও সমন্বয় করা।
প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে তিনি স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করতে স্থায়ী রেশন কার্ড, দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং কৃষকদের ভর্তুকি ও সহায়তা সরাসরি তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
গৃহিণী সুমাইয়া আক্তার বলেন, এবারের জাতীয় বাজেটে সরকার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রধান সংকট মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাঁর মতে, বাজেটে কী ঘোষণা করা হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেগুলোর বাস্তবায়ন।
তিনি বলেন, তরুণদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি খাত ও ক্ষুদ্র-বড় উদ্যোক্তাদের আরও বেশি সহায়তা দেওয়া উচিত। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
আগামী বাজেটে সরকারের কাছে তাঁর প্রধান প্রত্যাশা হলো— কার্যকর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষায় বড় বিনিয়োগ এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ঝামেলামুক্ত ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা।
প্রান্তিক মানুষের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, কৃষকদের সারের দাম কমানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার। তাঁর ভাষায়, প্রান্তিক মানুষ ভালো না থাকলে দেশের অর্থনীতিও কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।
আরটিভি/ এসকেডি




