টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ, জোয়ারের পানি এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার কৃষি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় আউশ ধান, বীজতলা, মৌসুমি সবজি, ফল, মরিচ ও পানের বরজসহ প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৮০ হাজার কৃষক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। প্রাথমিকভাবে কৃষকদের ২০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলার চরকিং চরকৈলাশ গ্রামের কৃষক কামাল উদ্দিন (৫৫)। জাহাজমারা–নলচিরা প্রধান সড়কের পাশে ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা পরিচর্যা করতে দেখা যায় তাকে। কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলে কামাল জানান, গত ১০ দিন আগে ৩০ ডিসিমিল জমিতে ৬০ কেজি আমনের বীজ বপন করেন। টানা বর্ষণে তার বীজতলাটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। পরে বীজতলার চার পাশে উঁচু আড়ী বেঁধে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে। কিন্তু তাতে ও শেষ রক্ষা হয়নি। পানি শুকানোর সাথে সাথে নুয়ে পড়ছে বীজতলার ছোট ছোট ধানের চারা গুলি। অনেকটা আশা ছেড়ে দিয়ে পুনরায় বীজ বপনের চিন্তা করছেন কামাল। এজন্য তাকে ব্যয় করতে হবে মোটা অঙ্কের টাকা।
তিনি আরও জানান, গত কয়েকদিন স্যালো মেশিন দিয়ে বীজতলার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা করেছেন। আবার শ্রমিক নিয়োগ করে নিজেরা পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে চারা গুলো হলুদ বর্ণ থেকে লাল বণ হয়ে যাচ্ছে। উপ- সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে দেখিয়েছেন তিনি পুনরায় বীজতলা তৈরি করতে বলেছেন। এই চারা দিয়ে ধান রোপণ করা যাবে না বলে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
শুধু কৃষক কামাল উদ্দিন নয় একই অবস্থা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার সব এলাকাতেই। উপজেলার চরকিং ও চরঈশ্বর ইউনিয়ন সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু ভারি বর্ষণের ফলে তলিয়ে গেছে এই দুই ইউনিয়নের অধিকাংশ সবজি খেত। এখন পানি চলে যাওয়ার পর সবজি গাছগুলো গোড়ায় পচন ধরে মরে যাচ্ছে। অনেকে নিজেদের সহায় সম্বল বিক্রি করে এই সবজি চাষ শুরু করেন। আবার অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষে নেমেছেন। এখন মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে ক্ষেতের পাশে।
চরঈশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব গামছাখালী গ্রামটি সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানে কৃষক ১২ মাস সবজি চাষ করে থাকেন। গত বুধবার বিকেলে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে দেখা হয় সবজি খেতে। তাদের মধ্যে একজন জমির এক পাশ থেকে নিজের চাষ করা সবজি গাছ টেনে তুলে ফেলছেন।
কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলে মোতাহের হোসেন নামে এই কৃষক জানান, প্রায় এক একর জমিতে ঝিংগা চাষ করেছেন। এখনো বিক্রি করার মতো পরিপক্ব হয়নি খেতের সবজি গুলো। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে গাছের গোড়া পচে গেছে। এখন রোদের কারণে গাছ মরে গিয়ে লাল হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু গাছ এখনো সতেজ মনে হলেও অধিকাংশ গাছ লাল হয়ে নেতিয়ে যাচ্ছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যে পুরো খেত একই অবস্থা হয়ে যাবে। তাতে অপেক্ষা না করে এই গাছগুলো তুলে পেলে দিয়ে নতুন করে সবজি চাষের জন্য চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।
মোতাহের আরও জানান, এনজিও থেকে টাকা নিয়ে এই সবজি ক্ষেত তৈরি করেছেন। তাতে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবজি বিক্রি করে এক টাকাও আয় করতে পারেননি। অন্যদিকে গত কয়েকদিন পানি নিস্কাশনসহ শ্রমিক নিয়োগ করে আরও কিছু টাকা ব্যয় করেছেন এই ক্ষেতে। এখন সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে নতুন করে সবজি চাষ করবেন। না হয় বেকার সময় পার করতে হবে।
গামছাখালী গ্রামের প্রবিন কৃষক নাজিম উদ্দিন জানান, কৃষক অতি বৃষ্টির কথা চিন্তা করে সবজি ক্ষেতে উঁচু আড়া বেঁধে চাষ করেছে। কিন্তু অধিক বৃষ্টিতে তাও তলিয়ে গেছে। তাতে হাতিয়ার প্রতিটি ইউনিয়নে সবজি থেকে সবার অবস্থা একই। সরকারিভাবে বীজ, সার ও কীটনাশক দেওয়া হয় বিভিন্ন সময়। কিন্তু এবার নগদ অর্থ না দেওয়া হলে কৃষক উঠে দাঁড়াতে পারবে না। কারণ- অনেকে নিজেদের সহায় শেষ সহায় সম্বল ও মূলধন ব্যয় করেছে এই সবজি চাষে। তাতে অনেকে নি:স্ব হয়ে পড়েছে। সামান্য বীজ, সার ও কীটনাশক দিয়ে তাদের নতুন করে সবজি চাষ সম্ভব হয়ে উঠবে না।
নাজিম উদ্দিন আরও জানান, গত ১০ বছরে ও হাতিয়াতে এমন বৃষ্টি হয়নি। এজন্য কৃষকরে আগাম প্রস্তুতিও ছিল না। এজন্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, টানা বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায় ২১ হাজার ৫২০ হেক্টর আউশ ধান, ১ হাজার ৯২০ হেক্টর আমন বীজতলা, ৯৫০ হেক্টর মৌসুমি শাকসবজি, ৫৮ হেক্টর বিভিন্ন ফলের বাগান, ৪ হেক্টর মরিচ এবং ১০ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাতে ৮০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাতে আনুমানিক ২০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল বাছেদ সবুজ বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছে। তারা ক্ষতিগ্রস্থ জমিতে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। টানা বৃষ্টিতে হাতিয়াতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষকের। ইতোমধ্যে আমরা একটি প্রতিবেদন জেলা অফিসে পাঠিয়েছি। তাতে ইউনিয়নভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের জন্য বরাদ্ধ দেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএইচজে




