প্লাস্টিক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে ইনসেনটিভ ও ভ্যাট ফ্রি হলে বাড়বে অ্যাসেম্বলি ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি : জসিম উদ্দিন (অডিও)

আরটিভি অনলাইন রিপোর্ট

সোমবার, ২৪ জুলাই ২০১৭ , ০৭:৫৯ পিএম


প্লাস্টিক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে ইনসেনটিভ ও ভ্যাট ফ্রি হলে বাড়বে অ্যাসেম্বলি ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি : জসিম উদ্দিন (অডিও)

আশির দশকে গৃহস্থালি পণ্যসামগ্রী তৈরির মধ্য দিয়ে দেশের প্লাস্টিক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে ৫ লাখ এবং পরোক্ষভাবে ১৩ লাখ লোক কাজ করছেন। নব্বইয়ের দশকে রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের জন্য হ্যাঙ্গার, পলিব্যাগ, বোতামসহ বিভিন্ন উপকরণ তৈরির মধ্য দিয়ে প্লাস্টিক শিল্পের বিপ্লব ঘটে।

বর্তমানে পোশাক ছাড়াও ওষুধ, ইলেক্ট্রনিকসহ নানা পণ্য মোড়কে প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক উপকরণ রপ্তানি হচ্ছে। দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৫ হাজার ৩০টি প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। রপ্তানিতে প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও আছে এ খাতে। পাশাপাশি দেশীয় বাজারে রয়েছে প্লাস্টিকের বেশ চাহিদা।

এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন যারা দেশীয়ভাবে ম্যানুফ্যাকচারিং করছেন যদি তাদের ইনসেন্টিভ ও ভ্যাট মওকুফ করা হয় তাহলে বাংলাদেশে অ্যাসেম্বলি ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি বাড়বে। পাশাপাশি সরকার রি-সাইক্লিংয়ের ওপর জোর দিলে এ খাতের প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ সম্ভব হবে।  

প্লাস্টিক খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আরটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রথম সহসভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিথুন চৌধুরী।

১. রি-সাইক্লিংয়ের বাইরে এক তৃতীয়াংশ প্লাস্টিক বর্জ্য রয়েছে। এ বিষয়ে কি করতে পারে সরকার?

জসিম উদ্দিন : প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিতে কারখানার বর্জ্য শতভাগ রি-সাইক্লিং হয়ে যায়। উৎপাদনের সময় যে বর্জ্য তৈরি হয় তাও রি-সাইক্লিং হয়। তাই বলা যায় প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয় না। তবে বর্জ্য হয় ভোক্তাদের ব্যবহারের পর। ভোক্তাদের ব্যবহারের পর তৈরি হওয়া বর্জ্যের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সংগ্রহ হচ্ছে না। মূলত টোকাই, ভাঙ্গারি দোকান ও ফেরিওয়ালারা ভোক্তাদের কাছ থেকে ব্যবহার করা প্লাস্টিক সংগ্রহ করছে। ফলে ব্যবহার করা প্লাস্টিক অন্যান্য আবর্জনার সঙ্গে যোগ হয়ে যাচ্ছে। এতে কোয়ালিটিফুল প্লাস্টিক পাওয়া যায় না। অনেক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে রি-সাইক্লিং দানা এনে পণ্য তৈরি করে তা ক্রেতাদের চাহিদা অনুসারে সরবরাহ করছে। তবে উন্নত দেশের মতো প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করলে শতভাগ রি-সাইক্লিং সম্ভব হবে। এর জন্য সরকার, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকারকে জোট হয়ে কাজ করতে হবে।   

  

২. মুন্সিগঞ্জে প্লাস্টিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হচ্ছে। এর অগ্রগতি কি?

জসিম উদ্দিন : মুন্সিগঞ্জে ৫০ একর জমি নিয়ে প্লাস্টিক শিল্পনগরী স্থাপনের কথা রয়েছে। এ নিয়ে ১২ বছর আগে বিসিকের সঙ্গে আমরা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করি। যা প্রজেক্ট আকারে বর্তমান সরকারের অধীনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে পাস হয়েছে। এখন সরকার ভূমি অধিগ্রহণ করছে। তবে প্রজেক্টটি বেশ দেরি হয়েছে। শিল্পমন্ত্রীও প্রজেক্টটি বাস্তবায়নে খুব আন্তরিক। আশা করছি অতি শিগগিরই প্রজেক্টটি বাস্তবায়ন করবেন। বিশেষ করে ক্লাস্টার অবস্থায় থাকা পুরান ঢাকা, ইসলামবাগ, লালবাগে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২শ’ থেকে ৩শ’ কারখানার জন্য শিল্পনগরী খুব দরকার। ছড়িয়ে ছিটে থাকা এ কারখানাগুলো যেমন ঝুঁকিতে রয়েছে তেমনি আশপাশের মানুষও বেশ ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রথম ধাপে ঝুঁকিতে থাকা কারখানা মুন্সীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে। কিন্তু ৫০ একর জমিতে প্লাস্টিক নগরী পরিপূর্ণতা পাবে না। তাই প্লাস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেপজাকে জায়গার পরিমাণ বাড়াতে সুপারিশ করেছি। বেপজা মুন্সিগঞ্জে ১০৫ একরের প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি আমাদের চিঠি দিয়ে সুপারিশের জবাব দিয়ে আশ্বস্ত করেছে। যদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কারখানাগুলোকে একত্রিত করা না হয় তাহলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানো কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে। এখন আমাদের গুটিকয়েক ইন্ডাস্ট্রি রপ্তানি করে। রপ্তানিযোগ্য ইন্ডাস্ট্রি না বাড়লে বিদেশের বাজারের পরিধি বাড়বে না। যেমন গার্মেন্টস খাতে রপ্তানিযোগ্য প্রতিষ্ঠান বেশি থাকায় তাদের বিশ্বে বাজারও বেশি।

৩. পণ্য পরিবহনে সুবিধার জন্য মহাসড়কের দু’ পাশে শিল্পকরিডোর স্থাপন প্রকল্প ব্যবসা প্রসারে কি ভূমিকা রাখবে?

জসিম উদ্দিন : এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে দেশে ব্যবসার পরিবেশ আরো উন্নত হবে। প্লাস্টিক খাত খুব নিরাপদ একটি খাত। ফুড, মেশিনারি, ফার্মেসি, প্যাকেজিং ও তৈজসপত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েই চলছে। বিশ্বে বড় বড় রিটেইলারের র‌্যাঙ্কিংয়ে ১ থেকে ১০ এর মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক। এছাড়া  বিদেশি ক্রেতাদের দেশে আনাগোনাও বেশ। আমাদের এখন দরকার কমপ্লায়েন্স ও বিশ্বমানের ফ্যাক্টরি। বর্তমানে তিন হাজার থেকে চার হাজার কোটি টাকার লিঙ্কেজ ও সরাসরিভাবে প্লাস্টিক রপ্তানি হয়। বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসছে ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের প্লাস্টিক রপ্তানি হওয়া সম্ভব। যা বর্তমানে ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। প্লাস্টিক খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও সরকারের পলিসি এ খাতের রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে পারে। সে হিসেবে শিল্প করিডোরে প্লাস্টিককে প্রাধান্য দেয়া উচিত।

৪. প্লাস্টিক খাতের লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং নিয়ে কিছু বলবেন কি?

জসিম উদ্দিন : দেশের মানুষের মাথাপিছু পরিমাণ বাড়ার কারণে বাড়বে প্লাস্টিক খাতের ব্যবহার। সরকারকে পলিসি আকারে যদি লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং এ গুরুত্ব দেয়া না হয় তাহলে লিঙ্কেজ কারখানার সংখ্যা বাড়বে না। ফলে বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। যারা দেশীয়ভাবেও ম্যানুফ্যাকচারিং করছে তাদের ইনসেনটিভ ও ভ্যাট ফ্রি করা হলেও বাংলাদেশে অ্যাসেম্বলি ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি বাড়বে।

৫. ২০১৬ সালে তিন হাজার ৭শ’ কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। এ বছর কেমন হতে পারে।

জসিম উদ্দিন : প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এবছর আরো বাড়বে।

৬. পরিবেশবান্ধব সবুজ প্লাস্টিক কারখানা তৈরিতে আপনি কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

জসিম উদ্দিন : প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিগুলোতে গেলো কয়েকবছর ধরে বেশ পরিবর্তন হয়েছে। পুরনো মেশিনের পরিবর্তে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নতমানের মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহার সাশ্রয়ী হয়েছে। প্লাস্টিক ফ্যাক্টরি মূলত গ্রিন কারখানা, কারণ এখান থেকে কার্বন ছড়ায় না। ইন্ডাস্ট্রি আবর্জনা সৃষ্টি হয় না।

এদিকে যারা নতুন ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আসবে তাদের গ্রিন কনসেপ্ট নিয়ে আসা উচিত।

৭. বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) দক্ষ জনবল তৈরিতে কি ভূমিকা রাখছে?

জসিম উদ্দিন: দক্ষ জনবলের অভাবে বাংলাদেশের প্লাস্টিক সেক্টরে অগ্রগতি হচ্ছে না। সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লাস্টিক খাতের ওপর একটি বিষয় রয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে পড়ানো হয় না। বিষয়টি মাথায় রেখে প্লাস্টিকশিল্প খাতে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ, পণ্য পরীক্ষা ও মান উন্নয়নে বিভিন্ন গবেষণা করতে ২০১৪ সালে আগস্টের দিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিআইপিইটি থেকে বেশ কয়েকটি ব্যাচ এরই মধ্যে বের হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি পুরাপুরি চালু হলে এর শিক্ষার্থীরা প্লাস্টিক পণ্য তৈরি এবং রপ্তানিতে সরাসরি অবদান রাখবে। তবে দক্ষ কর্মীর পাশাপাশি দেশে দক্ষ ম্যানেজারের বেশ অভাব রয়েছে। বহির্বিশ্বে আমাদের দেশ থেকে অনেকে শ্রমিক হয়ে গেলেও খুবই কম আয় করছে। উল্টো বেশ কয়েকগুণ বেশি অর্থ দিয়ে বিদেশি ম্যানেজার আনতে হচ্ছে। তাই দক্ষ ম্যানেজার তৈরিতে সরকারের জোর দেয়া উচিত।

৮.জিএসপি সুবিধা না থাকায় এ খাত কেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?

জসিম উদ্দিন : ২০১৩ সালের ২৭ জুন জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রিফারেন্সেস অথবা জিএসপি স্থগিতের ঘোষণার আগে প্লাস্টিক সামগ্রী জিএসপি সুবিধা পেত। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অবাধ বাজারসুবিধা (জিএসপি) স্থগিতে গার্মেন্টস খাত দায়ী। গার্মেন্টস খাতের অস্থিতিশীলতার কারণে জিএসপি সুবিধা বাতিল করলেও এ খাতটিতে কোনো প্রভাব পড়ছে না। কিন্তু প্লাস্টিক খাতে প্রভাব ফেলছে। যার ফলে জিএসপি সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত একটি রাজনৈতিক গেম। জিএসসি পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এসব ক্ষতিগ্রস্ত খাতকে নগদ সুবিধা দেয়া হলেও তা সঠিক সময়ে ব্যবসায়ীরা পাচ্ছেন না। আমরা প্লাস্টিক খাতের শ্রমিকদের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সবাইকে গ্রুপ বীমার আওতায় নিয়ে আসছি।

৯. নতুন ভ্যাট আইন ২ বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়ায় প্লাস্টিক খাত কতটা লাভবান হয়েছে? রাজস্ব বোর্ড ভ্যাট আইন নিয়ে কি করতে পারে?

জসিম উদ্দিন: আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই অনেক কথাবার্তা হয়েছে। যেহেতু সরকার আইনটি বাস্তবায়ন পিছিয়ে দিয়েছে, তাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচিত হবে, আলাপ-আলোচনা করে আইনটিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। না হলে বর্তমানে যেসব কারণে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না, ২০১৯ সালেও একই সমস্যা থাকবে। ভ্যাটের হার নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। যারা ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে পারছে, তারা কিন্তু দিয়ে যাচ্ছে। তবে যাদের এতোদিন ভ্যাট ছিল না তাদের ওপর তো একবারে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা উচিত না। আমার মনে হয়, এখানে ভ্যাটের একটি হার না দিয়ে একাধিক হার করা দরকার। কমপক্ষে ২-৩টি হার হলে ভালো হয়। ভ্যাট প্রদানকারীর সংখ্যাও বাড়ানো উচিত।

 

এমসি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission