ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ সামাল দিতে গভর্নর বা নীতিনির্ধারকদের ব্যক্তিপর্যায়ে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকা, আর্থিক স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তার মতে, কোনো রাজনৈতিক দলের দাসত্ব না করে আল্লাহ ছাড়া কাউকে খাতির না করার মানসিকতা ছিল বলেই চাপ সত্ত্বেও তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশ কমাতে পেরেছিলেন।
দেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ফরাসউদ্দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তার তিন বছরের অভিজ্ঞতা ও নানা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের চাকরিসূত্রে আর্থিক সচ্ছলতা থাকা এবং পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আর্থিক চাওয়া না থাকায় তাকে কোনো অসাধু উপায়ে জড়াতে হয়নি। এমনকি গভর্নর হিসেবে পাওয়া বেতনও তিনি নেননি, তা দিয়ে দরিদ্র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য একটি আবর্তক বৃত্তি তহবিল গড়ে তুলেছিলেন।
খাতটির খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সাবেক এই গভর্নর বলেন, তৎকালীন সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়া এক প্রভাবশালী খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকা কাটতে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও সুপারিশ এসেছিল। তবে আইনি বাধ্যবাধকতায় তিনি সেই ঋণ কাটতে অস্বীকৃতি জানান।
সংসদীয় কমিটি ও নানা জায়গা থেকে তীব্র চাপ আসা সত্ত্বেও তিনি এবং তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া শক্ত অবস্থান নিয়ে প্রভাবশালী ঋণখেলাপির ঋণ সুবিধা বন্ধ রেখেছিলেন। এতে তার সময়ে খেলাপি ঋণ ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ভূমিকার মূল্যায়ন করে প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, দল নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে কাজ করার সময় কিবরিয়া সাহেব অত্যন্ত সাহসী ছিলেন, তবে পরবর্তীতে দলীয় এমপি ও মন্ত্রী হওয়ার পর কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখাতে বাধ্য হন। একজন সফল অর্থমন্ত্রী হতে গেলে অ্যাকাউন্টিংয়ের পাশাপাশি বড় রাজনৈতিক দর্শন ও ‘বৃহৎ কলিজা’ লাগে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শৃঙ্খলা ফেরাতে নেওয়া সংস্কারের কথা তুলে ধরে ফরাসউদ্দিন জানান, মেধাভিত্তিক নিয়োগে বিশেষ প্রণোদনা, মানিটারি পলিসিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংক মালিকেরা যেন নিজ ব্যাংক থেকে ইচ্ছা অনুযায়ী লোন নিতে না পারেন—কোম্পানি আইনের এই বিধান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা, ব্যক্তিগত সততা ও ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার না করার মানসিকতাই ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।
আরটিভি/এআর




