বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সারা দেশে যে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৬ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত টানা সংঘর্ষ, পুলিশি অভিযান, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতার পর ১৯ জুলাই আসে এক ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে। সেদিন ক্যাম্পাসে বড় ধরনের নতুন সংঘর্ষ না হলেও পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বিরাজ করছিল এক অস্বাভাবিক নীরবতা, উৎকণ্ঠা এবং অনিশ্চয়তার আবহ।
১৯ জুলাইয়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছিল এমন একটি ক্যাম্পাস, যেখানে শ্রেণিকক্ষ ছিল প্রায় ফাঁকা, আবাসিক হলগুলো দ্রুত খালি হয়ে যাচ্ছিল, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল সীমিত এবং শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ। আগের কয়েক দিনের সংঘর্ষের স্মৃতি তখনও ছিল তাজা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের চিহ্ন, ভাঙচুরের ক্ষত এবং আতঙ্কের ছাপ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল।
এর আগে ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্যাম্পাসে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ১৭ জুলাই শিক্ষার্থীরা প্রশাসন ভবন ঘেরাও করেন। পরে পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে উপাচার্যকে বের করে আনে। ওই অভিযানে কয়েকজন শিক্ষার্থী আটক হন এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
১৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক শিক্ষার্থী আবাসিক হল ত্যাগ করতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনা, পরিবারগুলোর উদ্বেগ এবং সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ক্যাম্পাস দ্রুত জনশূন্য হয়ে পড়ে।
একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবি পূরণ না হওয়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকার প্রতিবাদে তারা উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তারসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতীকী জানাজা আদায় করেন।
জানাজা শেষে শিক্ষার্থীরা বিশেষ মোনাজাতে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের আস্থা হারিয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের সম্মতিতেই পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে টানা দুই দিনের সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে এবং শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবাসিক হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী অধিকাংশ শিক্ষার্থী হল ছেড়ে চলে যান। ক্যাম্পাসজুড়ে মাইকিং করে বাকি শিক্ষার্থীদেরও হল ত্যাগ এবং দোকানপাট বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়।
১৮ জুলাই বিকেলে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা–রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন এবং সারা দেশের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই আসে ১৯ জুলাই। সেদিন সারা দেশে কারফিউ কার্যকর হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এর প্রভাব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও স্পষ্টভাবে পড়ে। ক্যাম্পাসের প্রবেশপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়। ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যত বন্ধ থাকে এবং শিক্ষার্থীদের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে যায়।
১৯ জুলাইকে অনেকেই ‘নীরবতার দিন’ হিসেবে স্মরণ করেন। সংঘর্ষের শব্দ না থাকলেও অনিশ্চয়তা ছিল প্রবল। আবাসিক হলগুলোতে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন। অনেকেই পরিবারে ফিরে যান, আবার কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে চলে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য সেদিন অনুপস্থিত ছিল।
শিক্ষকদের মধ্যেও উদ্বেগ ছিল স্পষ্ট। অনেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার পক্ষে মত দেন। প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, ১৯ জুলাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আন্দোলনের সংগঠন ও সমন্বয় অক্ষুণ্ন রাখা। আমরা মেহেরচণ্ডিতে অবস্থান করলেও রাজশাহী শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা আন্দোলনকারী এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম। কারফিউ, গোয়েন্দা নজরদারি ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কার কারণে প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হতো। অনেক সময় ফোনে, আবার অনেক সময় বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অর্থসংকট ও খাদ্যসংকটের মধ্যেও আমরা হাল ছাড়িনি। স্বল্প সামর্থ্যে রান্না করে দিন কাটিয়েছি, প্রয়োজনে চাঁদা তুলে খরচ চালিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস ছিল, আন্দোলন শুধু ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নিরাপদে থেকে সমন্বয় বজায় রাখাও তখন সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল। তাই ১৯ জুলাই আমরা প্রকাশ্যে না থাকলেও আন্দোলনের সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে নিরলসভাবে কাজ করেছি।
আরেক সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা বলেন, ১৫ জুলাই দুপুরের কর্মসূচির পর আমার বক্তব্য ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হতে পারে—এমন সতর্কবার্তা পাই। সঙ্গে সঙ্গে আমি মেহেদী সজীবকে ফোন করি। আমরা দ্রুত হল ত্যাগ করে মেহেরচণ্ডিতে এক বড় ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নিই। ১৯ জুলাইও আমরা সেখানেই অবস্থান করছিলাম। কারফিউ চলছিল, চারদিকে অভিযান ও গ্রেপ্তারের আতঙ্ক ছিল। তাই প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আমরা নিরাপদ আশ্রয়ে থেকেই আন্দোলনের বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, তথ্য আদান-প্রদান এবং পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে সমন্বয় করছিলাম। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা কোথায় অবস্থান করছে, কে নিরাপদে আছে এবং কোথায় কী পরিস্থিতি, এসব বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজ নেওয়া হতো। সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমরা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।
ফিরে তাকালে ১৯ জুলাই ২০২৪ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো সবসময় সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষপূর্ণ হয় না। কখনও কখনও নীরব ক্যাম্পাস, ফাঁকা আবাসিক হল, বন্ধ শ্রেণিকক্ষ এবং উদ্বিগ্ন মানুষের চোখই একটি জাতির সংকটের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষ্য হয়ে ওঠে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ১৯ জুলাই তাই কেবল একটি তারিখ নয়; এটি এক অনিশ্চয়তা, প্রতিরোধ এবং স্মৃতিবহুল সময়ের প্রতীক।
আরটিভি/টিআর




