লটকন যেভাবে গাছের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত ফলন আসে তা দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। লটকন বা নটকো (বৈজ্ঞানিক নাম Baccaurea motleyana) এক প্রকার টক মিষ্টি ফল।গাছটি দক্ষিণ এশিয়ায় বুনো গাছ হিসেবে জন্মালেও বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে বাণিজ্যিক চাষ হয়।

একসময় বাংলাদেশে অপ্রচলিত ফলের তালিকায় ছিল লটকন। কিন্তু বর্তমানে এই ফল বাণিজ্যিক আকারে ব্যাপক আকারে উৎপাদন হচ্ছে। উন্নত জাতের সুমিষ্ট লটকনের চাষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর জনপ্রিয়তাও বেশ বেড়ে যাচ্ছে।
নরসিংদীতে ফলন বেশি হলেও সিলেট, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাজীপুর জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের চাষ হচ্ছে।
আর লটকন চাষাবাদ একদম সহজ এবং বলা যায় খুব অল্প যত্নেই গাছ বেড়ে ওঠে। নরসিংদির এক বাগান মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়,একটা গাছে আনুমানিক ৫ থেকে ১০ মণ লটকন উৎপাদন হয়ে থাকে যা আনুমানিক ১২০ টাকা থেকে ২০০+ টাকা দরে বিক্রি করা যায়।

বুনো ফল লটকনে বহু রকমের পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এই ফলে পানি, প্রোটিন, আঁশ, বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন এবং অন্যান্য খনিজ উপাদান রয়েছে। লটকনে আছে অ্যামাইনো অ্যাসিড ও এনজাইম যা দেহ গঠন ও কোষকলার সুস্থতায় সহায়তা করে।
এক সময় স্থানীয় লোকজন জংলি ফল বলে ডাকতো। অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ওষুধি গুণে ভরপুর এই লটকন। শুরুর দিকে বন-বাদাড় আর ঝোপ-ঝাড়ে জন্ম নেওয়া এ ফলের তেমন কদর না থাকলেও সময়ের ব্যবধানে এ ফলের কদর বেড়েছে বহুগুণ। যার কারণে বর্তমানে এ ফলটি দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে।
নরসিংদীতে লটকন চাষের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, প্রায় ১২০ বছর পূর্বে শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আজকিতলা গ্রামে লটকন চাষের গোড়াপতন করেন মরহুম হাজি আব্দুল আজিজ। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে তা ছড়িয়ে পরে রায়পুরা এবং বেলাব উপজেলার লাল মাটির এলাকায়। সময়ের ব্যবধানে সম্পূর্ণ নরসিংদীতে এ লটকন বাণিজ্যিকভাবে ছাড়াও প্রায় বাড়ির আঙ্গিনাতে পারিবারিক ফলের চাহিদা মেটাতে লটকন গাছ লাগাচ্ছে।

আসুন এর উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নিই
টক-মিষ্টি ও রসালো ফলটি খেতে যেমন মুখরোচক, তেমনি এর উপকারিতাও অনেক। ১০০ গ্রাম লটকনে পাওয়া যায় ৯২ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি। একই পরিমাণ লটকনে ভিটামিন সি রয়েছে ১৭৮ মিলিগ্রাম, শর্করা ১৩৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ১৭৭ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৬৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-১ ১৪.০৪ মিলিগ্রাম এবং ভিটামিন বি-২ শূন্য দশমিক ২০ মিলিগ্রাম। তবে ডায়াবেটিস রোগী হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে।
এছাড়াও লটকনের রয়েছে অনেক স্বাস্থ্যগুণ-
হজমে সহায়ক: লটকনে প্রচুর আঁশ রয়েছে। যা হজমপ্রক্রিয়া ঠিকমতো কাজ করতে সাহায্য করে।
ক্যানসার প্রতিরোধ: লটকনে রয়েছে ক্যানসার প্রতিরোধী উপাদান। নিয়মিত খাদ্যতালিতায় এই ফল রাখুন।
শরীরে আর্দ্রতা ঠিক রাখে: লটকরে প্রচুর পানি থাকে যা শরীরকে ডিহাইড্রেট হ্ওয়া থেকে রক্ষা করে। এছাড়া্ও তৃষ্ণা নিবারণের জন্য খেতে পারেন লটকন। এছাড়াও এখান থেকে আপনি ভালো নিউট্রিশনাল উপাদান পেতে পারেন।

চর্মরোগ প্রতিকার: শরীরের বিভিন্ন চর্মরোগে প্রতিকারে শক্তিশালী উপাদান হিসেবে বিবেচিত লটকন। এই ফল খোচপাচড়া, ক্যাবিস, দাদ প্রতিকারে বেশ কার্যকরী।
সুগারের মাত্রা ঠিক রাখে: লটকন খেলে রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে অতিরিক্ত সুগার নেই, তাই যতই খান না কেন শরীরে ব্লাড সুগার মাত্রা বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
শরীরে শক্তির উৎস: লটকন ফল শরীরে শক্তি বৃদ্ধি করে। এতে পর্যাপ্ত ভিটামিন, খনিজ এবং প্রোটিন রয়েছে যা খাওয়ার পর পরই শরীরে বল পাওয়া যায়। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় লটকন রাখলে সারাদিন কর্মক্ষম থাকবেন।
আরটিভি/এসকে




