পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জেরে হঠাৎই ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে যৌথ এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টিরও বেশি প্রদেশ। জবাবে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। ইসরায়েলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর জবাব দিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক হামলা করে যাচ্ছে দেশটি।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে ইরানি বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে বার্তাসংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, কিছু দেশে যুক্তরাষ্ট্রের একের অধিক ঘাঁটি রয়েছে। ফলে সেসব দেশের আলাদা আলাদা স্থানে হামলা হয়েছে। একটি দেশের শুধুমাত্র একটি ঘাঁটিতেই হামলা সীমাবদ্ধ ছিল না।
এদিকে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের সেনারা যুক্তরাষ্ট্রের এমএসটি যুদ্ধজাহাজে হামলা চালিয়েছে। এতে জাহাজটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ তথ্য অস্বীকার করেছে।
আইআরজিসি বলেছে, শত্রু চূড়ান্তভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাবে ইরান।
কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, ইরানে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার সঙ্গে জড়িত সব স্থাপনা এখন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীর ‘‘বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে’’ পরিণত হবে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সেই সব স্থানকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করছে, যেখান থেকে মার্কিন ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সব স্থাপনাও আমাদের লক্ষ্যবস্তুর অন্তর্ভুক্ত।
এদিকে ইরানের ৩১ প্রদেশের ২০টিতেই হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। হামলায় বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয় ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বাসভবনকে। পাশাপাশি মন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের বাসভবন, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের স্থাপনাসহ অন্যান্য স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। শুধু ইরানের শাসকগোষ্ঠীই নয়; ইসরায়েলি হামলার টার্গেটে পরিণত হয়েছে কোমলমতি শিশুদের স্কুলও। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে চালানো ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫১ শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইরানে হামলার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘বড় ধরনের যুদ্ধাভিযান’ চালিয়েছে। আমরা বারবার একটি চুক্তি চেয়েছি। আমরা চেষ্টা করেছি। তিনি বলেন, আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা জ্বালিয়ে দিতে যাচ্ছি। এটা পুরোপুরি ধ্বংস করা হবে।
ইরানে চলমান ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরানের সার্বভৌমত্বকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। বেইজিং সব পক্ষকে উত্তেজনা এড়াতে এবং পুনরায় সংলাপ শুরু করার আহ্বান জানাচ্ছে।
আর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, পরিস্থিতিকে দ্রুত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরিয়ে নিতে হবে। এই সামরিক আগ্রাসন পুরো অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত দ্রুত এসব ‘দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডের’ নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা। রাশিয়া আগের মতোই আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক সম্মান এবং স্বার্থের ভারসাম্যের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
এছাড়া, ইরানের ওপর হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, সামরিক অভিযান চালানোর আগে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক আলোচনা ছিল কেবল বিষয়টিকে আড়াল করার জন্য।
মেদভেদেভ বলেন, ‘শান্তির দূত আবারও তার আসল চেহারা দেখিয়েছে। ইরানের সঙ্গে সব আলোচনা ছিল একটি আড়াল মাত্র। এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না। বাস্তবে কেউ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়নি।’
এদিকে ইরানের পাল্টা জবাব শুরুর পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, ইরান থেকে ছোড়া অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র তাদের আকাশসীমায় শনাক্ত করা হয়েছে। এই ভয়াবহ পাল্টা হামলার পর পুরো ইসরায়েলজুড়ে বিপদ সংকেত বা সাইরেন বেজে উঠেছে এবং নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইডিএফের পক্ষ থেকে জারি করা জরুরি সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের বড় ধরনের ঢেউ আমাদের সীমান্তের দিকে ধেয়ে আসছে। আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিমান বাহিনী এই হুমকিগুলো প্রতিহত করার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করছে।
আইডিএফ আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ নিখুঁত নয়, তাই বড় ধরনের প্রাণহানি এড়াতে জনগণকে অবিলম্বে আইডিএফের সুরক্ষা নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। তেল আবিবসহ ইসরায়েলের প্রধান শহরগুলোতে এখন মুহুর্মুহু সাইরেন আর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে, যা দেশটিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আরটিভি/এসএইচএম




