গাজার উৎসবমুখর রাতগুলোতে যে যুবকটির গানে একসময় বিয়েবাড়ি জমে উঠত, সেই আবদুল্লাহ নাত্তাত এখন নিস্তব্ধ। ৩০ বছর বয়সী এই শিল্পী একসময় গায়ক আর অভিনেতা হিসেবে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতেন। অথচ আজ সেই প্রাণবন্ত আবদুল্লাহর ঠিকানা হয়েছে একটি হুইলচেয়ার। ইসরায়েলি গোলার আঘাতে হারিয়ে যাওয়া সেই পা দুটোর জন্য তিনি আজও হাহাকার করেন। তবে আবদুল্লাহ একা নন; একই ঘটনা ঘটেছে তার চাচাতো ভাই দিয়া আবু নাহলের সঙ্গেও।
গত সেপ্টেম্বরের এক দুপুরে বাজার সেরে বাড়ি ফিরছিলেন আবদুল্লাহ। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তখন তিনি গাজা শহরের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আস-সারায়া মোড়ের কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ এক বিকট শব্দে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। যখন ধোঁয়া থেকে বের হলেন, আবদুল্লাহ দেখলেন তিনি মাটিতে পড়ে আছেন, আর শরীরটা যেন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন তিনি। দেখলেন একটি পা হাঁটু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, অন্যটি ক্ষতবিক্ষত। সেই থেকে আবদুল্লাহর জীবনের ছন্দ পাল্টে যায়। চার বছর বয়সী সন্তানের বাবা এই যুবক এখন বিছানায় শুয়ে শুধু হারানো দিনের কথা ভাবেন।
আবদুল্লাহর এই বিষণ্ণ দিনগুলোর একমাত্র সঙ্গী তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী দিয়া আবু নাহল। দুজনের ভাগ্য যেন একই ট্র্যাজেডির মলাটে বন্দি। তবে দিয়ার গল্পটি আরও বেশি কষ্টের। গত জুলাইয়ে এক গভীর রাতে যখন দিয়া তার স্ত্রী আর দুই কন্যাসন্তান- হালা ও সামাকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন একটি সরাসরি হামলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় তার সাজানো সংসার। দিয়া বেঁচে ফিরলেও তার তিন ও পাঁচ বছর বয়সী দুই মেয়ে আর স্ত্রী চিরতরে হারিয়ে যান। সেই একই হামলায় দিয়া তার একটি পা হারান, অন্য পা-টিও এখন অকেজো প্রায়।
হাসপাতালে যখন দিয়ার জ্ঞান ফেরে, তিনি নিজের পঙ্গুত্বের চেয়েও বেশি দগ্ধ হচ্ছিলেন প্রিয়জনদের হারানোর যন্ত্রণায়। দিয়া বলেন, আমি বারবার ভাবি, আমি কেন বেঁচে থাকলাম? পাশে শুয়ে থাকা মানুষগুলো চলে গেল, আর আমি এই পঙ্গু শরীর নিয়ে রয়ে গেলাম। আবদুল্লাহ যখন দিয়ার কথা শোনেন, তখন নিজের দুই পা হারানোর বেদনাকেও তুচ্ছ মনে হয় তার। গাজার ধুলোবালি আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে এই দুই বন্ধু এখন একে অপরের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে, সেখানে পঙ্গুত্ব বরণ করা মানুষের সংখ্যা এখন কয়েক হাজার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরে প্রায় ৬ হাজার মানুষ তাদের অঙ্গ হারিয়েছেন, যাদের বড় একটি অংশই কোমলমতি শিশু। সেখানে নেই কোনো উন্নত কৃত্রিম পা লাগানোর প্রযুক্তি, নেই পর্যাপ্ত ফিজিওথেরাপি কেন্দ্র। আবদুল্লাহ আর দিয়ার মতো হাজারো মানুষ এখন কেবল এক জোড়া কৃত্রিম পায়ের স্বপ্নে রাত পার করেন। প্রতি রাতে বিছানায় শুয়ে আবদুল্লাহ কল্পনা করেন, পরদিন সকালে তিনি সুস্থ পায়ে হেঁটে বেড়াবেন।
তাদের লড়াই এখন আর কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়, বরং আবারও নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর এক তীব্র আকাঙ্ক্ষার। গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদে বসে তারা এখনো আকাশ দেখেন, এই আশায় যে হয়তো কোনো একদিন উন্নত চিকিৎসার সুযোগ আসবে, আর সেই কৃত্রিম পায়ে ভর করেই তারা জীবনের বাকি পথটুকু পাড়ি দেবেন।
আবদুল্লাহ ও দিয়া আশা করছেন, শিগগিরই চিকিৎসার জন্য তাদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হবে এবং সেখানে কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করা সম্ভব হবে।
সূত্র: আল-জাজিরা
আরটিভি/এএএ




