ধ্বংসের মুখে বিশ্বের নদীগুলোতে মাছের দীর্ঘ অভিবাসন, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬ , ১০:৪৮ পিএম


ধ্বংসের মুখে বিশ্বের নদীগুলোতে মাছের দীর্ঘ অভিবাসন, জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
কম্বোডিয়ার হ্রদে একটি মেকং জায়ান্ট ক্যাটফিশ। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের নদীগুলোতে মাছের বিস্ময়কর দীর্ঘ অভিবাসন বা মহাযাত্রা দ্রুত ভেঙে পড়ছে। জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে স্বাদুপানির মাছের সংখ্যা প্রায় ৮১ শতাংশ কমে গেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে কনভেনশন অন দ্য কনজারভেশন অব মাইগ্রেটরি স্পিসিস (সিএমএস)। এতে নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেব হোগান।

ড. হোগান বলেন, নদীর ওপরের শান্ত দৃশ্য দেখে বোঝা যায় না ভেতরে কী বিশাল এক জগৎ লুকিয়ে আছে। তার ভাষায়, পানির নিচে কোটি কোটি মাছ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রাণী অভিবাসনের অংশ হিসেবে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয়।

বিজ্ঞাপন

হাজার হাজার কিলোমিটারের বিস্ময়কর যাত্রা

স্বাদুপানির মাছের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ অভিবাসনের উদাহরণ হলো ডোরাডো ক্যাটফিশ। এই মাছ আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশ থেকে আমাজন নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আবার ফিরে আসে। প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা এই মাছ গবেষকদের কাছেও বিস্ময়ের বিষয়।

বিজ্ঞাপন

স্যামন ও ইল মাছের মতো পরিচিত প্রজাতির ক্ষেত্রেও এমন অভিবাসন দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রাকৃতিক চক্র দ্রুত ভেঙে পড়ছে।

মানবসৃষ্ট কারণেই বিপর্যয়

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাদুপানির মাছের এই সংকটের পেছনে প্রধানত মানুষের কর্মকাণ্ডই দায়ী। নদী ও হ্রদে দূষণ, বাঁধ নির্মাণের ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা এবং অতিরিক্ত মাছ শিকার—সব মিলিয়ে মাছের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।

এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এই বিষয়ে সনদের নির্বাহী সচিব এমি ফ্রেঙ্কেল বলেন, প্রাণীদের এই অভিবাসন প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময়। কিন্তু জীবনের প্রতিটি ধাপে তারা ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়ছে। এদের টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।

জীবিকা ও খাদ্যের বড় উৎস

অভিবাসী স্বাদুপানির মাছ বিশ্বের বহু দেশের মানুষের খাদ্য ও জীবিকার প্রধান উৎস।

কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদ, যা মেকং নদী ব্যবস্থার অংশ, সেখানে শতাধিক অভিবাসী মাছের প্রজাতি রয়েছে। গবেষকদের মতে, কখনও কখনও মাত্র এক ঘণ্টায় কয়েক টন মাছ ধরা সম্ভব হয়।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজন

বিশ্বের ১৩২টি দেশ বর্তমানে এই সনদের আওতায় রয়েছে এবং এ সপ্তাহে ব্রাজিল-এ তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে অভিবাসী মাছ সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর বাধা অপসারণ, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই মাছ শিকার— এসব পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে।

বিলুপ্তির পথে বহু প্রজাতি

বিশ্বের ১৫ হাজারের বেশি স্বাদুপানির মাছের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্তত ৩২৫টি প্রজাতি সীমান্ত অতিক্রম করে চলাচল করে এবং সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ২৪টি প্রজাতিকে সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।

বিশেষ করে মেকং নদী অববাহিকায় বড় আকারের প্রায় সব অভিবাসী মাছই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। অতিরিক্ত শিকারের কারণে অনেক প্রজাতির আকারও কমে গেছে।

আরও পড়ুন

ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে কিছু প্রজাতি

এরই মধ্যে কিছু অভিবাসী মাছ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইয়াংজি নদীর চীনা প্যাডলফিশ, যা ১৯৮১ সালে একটি জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের পর বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা— এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নদীর এই প্রাকৃতিক মহাযাত্রা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission