পাকিস্তানে ইটভাটার শ্রমিকদের টার্গেট করছে অবৈধ কিডনি ব্যবসায়ীরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬ , ১১:০৫ পিএম


পাকিস্তানে ইটভাটার শ্রমিকদের টার্গেট করছে অবৈধ কিডনি ব্যবসায়ীরা
ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানে ঋণের ফাঁদে আটকে থাকা ইটভাটার শ্রমিকদের টার্গেট করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অবৈধ কিডনি ব্যবসায়ীরা। দারিদ্র্য, ঋণ ও নিরুপায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক শ্রমিককে বাধ্য করা হচ্ছে নিজেদের অঙ্গ বিক্রি করতে। তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও তাদের জীবন পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের লাহোর শহরের উপকণ্ঠে একটি ইটভাটায় কাজ করা শফিক মাসিহ নামে এক শ্রমিক চরম দোটানায় পড়েন। ভাটার মালিকের কাছে জমে থাকা ঋণ শোধ করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে এই ঋণ ক্রমাগত বাড়ানো হয়।

এ অবস্থায় এক দালাল তার কাছে এসে কিডনি বিক্রির প্রস্তাব দেয়। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় বড় অঙ্কের অর্থের। পরিবারের দায়িত্ব ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি রাজি হন।

বিজ্ঞাপন

অস্ত্রোপচারের পর প্রতিশ্রুত টাকার চেয়ে কম অর্থ হাতে পান তিনি। সেই অর্থও ভাটার মালিককে দিয়ে দেন ঋণ শোধের আশায়। কিন্তু তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং আগের মতোই কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

কয়েক বছর পরও তার জীবন একই অবস্থায় রয়ে গেছে। শারীরিক দুর্বলতার কারণে আগের মতো কাজ করতে পারেন না, অথচ ঋণের বোঝা কমেনি।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অঙ্গ কেনাবেচা অবৈধ হলেও পাকিস্তানে এই বাণিজ্য গোপনে বিস্তার লাভ করেছে। শ্রমিক অধিকার সংগঠন বন্ডেড লেবার লিবারেশন ফ্রন্ট-এর আইনজীবী সাইয়েদ আইয়াজ হুসেইন মনে করেন, হাজার হাজার ইটভাটা শ্রমিককে কিডনি বিক্রিতে প্ররোচিত বা বাধ্য করা হচ্ছে। একই ভাটায় কাজ করা অনেক শ্রমিকের মধ্যেই কিডনি বিক্রির ঘটনা দেখা যায়, যা এ সমস্যার ব্যাপকতা নির্দেশ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রমিকরা প্রতিশ্রুত অর্থের তুলনায় কম টাকা পান।

পাকিস্তানে প্রায় ২০ হাজার ইটভাটায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন বলে ধারণা করা হয়। এদের অধিকাংশই ঋণদাসত্বে আবদ্ধ। ভাটার মালিকরা আগাম অর্থ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শ্রমিকদের কাজে নেয়। কিন্তু এই অগ্রিম অর্থই পরে ফাঁদে পরিণত হয়। হিসাবের অস্বচ্ছতা, অতিরিক্ত কাটাকাটি ও কম মজুরির কারণে ঋণ ক্রমেই বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

প্রতি এক হাজার ইট তৈরিতে শ্রমিকরা মাত্র কয়েকশ রুপি পান। একটি পরিবার দিনে প্রায় দুই হাজার ইট তৈরি করতে পারে, তবুও আয় এত কম যে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে আবার ঋণ নিতে হয়।

এই ভাটাগুলোতে শিশুদেরও অল্প বয়স থেকেই কাজে নামতে হয়। পরিবারসহ সবাই মিলে কাজ করলেও ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

নারী শ্রমিকরা একদিকে কাজ করেন, অন্যদিকে পরিবার সামলান— এ কারণে তারা আরও বেশি নির্যাতন ও শোষণের শিকার হন।

Untitled-2
ছবি: সংগৃহীত

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই কিডনি বাণিজ্য অনেক ক্ষেত্রেই মানব পাচারের পর্যায়ে পড়ে। যদিও শ্রমিকরা বাহ্যিকভাবে সম্মতি দেন, বাস্তবে দারিদ্র্য, ভয় ও চাপ তাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

আরও পড়ুন

অভিযোগ রয়েছে, কিছু ভাটা মালিকও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত এবং তারা লাভের অংশ পান। সাধারণত প্রথমে শ্রমিকদের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ানো হয়, এরপর দালালদের মাধ্যমে কিডনি বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এই ব্যবস্থায় একজন শ্রমিকের মৃত্যুর পর তার ঋণ সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পুরো পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই চক্রে আটকে পড়ে।

অনেক শ্রমিকই সন্তানের ভালো ভবিষ্যতের আশায় কিডনি বিক্রি করেন। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন পূরণ হয় না; বরং তারা আগের মতোই দারিদ্র্য ও ঋণের ফাঁদে বন্দি থেকে যান। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission