ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে পারস্য উপসাগরের বিস্ময়কর জগৎ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

রোববার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ , ০৩:৩১ পিএম


ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে পারস্য উপসাগরের বিস্ময়কর জগৎ
ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের খাসাবের কাছে হরমুজ প্রণালীর জলে একটি ডলফিন । ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন না হওয়ায় দীর্ঘ হওয়ার শঙ্কায় ইরান যুদ্ধ। এতে জনজীবন যেমন বিপদে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে, তেমনি ঝুঁকিতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের অসাধারণ প্রাকৃতিক জগৎ।

বহু বিতর্কিত হরমুজ প্রণালিতে রয়েছে ডলফিন ও এ অঞ্চলের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রবাল প্রাচীর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চারপাশে সংঘাত চলতে থাকায় এই পানির নিচের জগৎ এখন হুমকির মুখে।

অভিবাসন করা তিমি হাঙ্গররা ঋতুভেদে এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে, কারণ ইন্দো-প্যাসিফিক হাম্পব্যাক ডলফিন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক বটলনোজ ডলফিনরা উত্তর ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ বরাবর বাস করে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যবর্তী উপকূলীয় দ্বীপপুঞ্জ সবুজ ও হকসবিল সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান।

আরও পড়ুন

অভিবাসন করা তিমি হাঙ্গররা ঋতুভেদে এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে, কারণ ইন্দো-প্যাসিফিক হাম্পব্যাক ডলফিন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক বটলনোজ ডলফিনরা উত্তর ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপ বরাবর বাস করে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যবর্তী উপকূলীয় দ্বীপপুঞ্জ সবুজ ও হকসবিল সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান।

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসের মুখপাত্র নিনা নোয়েল বলেন, তাদের গবেষকেরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে এ অঞ্চলে তেলের স্তর শনাক্ত করছেন। মার্চের শুরুতে একটি ইরানি জাহাজে হামলার পর সেখান থেকেও তেল ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। সংস্থাটির মতে, জাহাজটি এখনও খুরান প্রণালির কাছে তেল ছড়াচ্ছে, যা আশপাশের সংরক্ষিত জলাভূমির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ইরান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময় প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার জাহাজ উপসাগরে আটকে ছিল। 

gopr0037

এসব জাহাজে মোট প্রায় ২১ বিলিয়ন লিটার তেল রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে অন্তত ১৬টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালি শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি গভীর ও ঠান্ডা ওমান উপসাগর এবং অগভীর ও উষ্ণ পারস্য উপসাগরের মাঝামাঝি একটি সংযোগস্থল। এখানকার স্রোত পুষ্টি উপাদান বহন করে, যা প্ল্যাংকটন, প্রবাল ও বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

20260408-hormuz-zoom-hp

আগের শান্ত সময়গুলোতে ওমানের মুসান্দাম অঞ্চলে স্কুবা ডাইভিং ও ডলফিন দেখা পর্যটকদের জন্য বড় আকর্ষণ ছিল। এই এলাকায় সামুদ্রিক কচ্ছপ ডিম পাড়ে, আর ওমান উপকূলে দেখা যায় বিরল আরবীয় হামব্যাক তিমি। আশপাশের পানিতে ডুগং ও সি স্নেকও আছে।

তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় তেল ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন বিজ্ঞানীরা। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী মার্টিন গ্রোসেল জানান, অপরিশোধিত তেলের অনেক রাসায়নিক উপাদান প্রাণীর হৃদযন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘসময় তেলের সংস্পর্শে থাকলে প্রাণীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে তারা সহজেই রোগে আক্রান্ত হয়।

ai2html-graphic-desktop.87ace6ed

তিনি আরও বলেন, তেল প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও প্রভাব ফেলে। এতে তাদের দিকনির্দেশনা বোঝার ক্ষমতা ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর দক্ষতা কমে যায়। ফলে শিকার ধরা বা শত্রুর হাত থেকে বাঁচা কঠিন হয়ে পড়ে, যা পুরো বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমুজ প্রণালীর জীববৈচিত্র্য

ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাঝামাঝি অবস্থিত এই প্রণালীকে অনেক গবেষক উপসাগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেন। এখানে বিশ্বের অন্যতম সহনশীল প্রবাল পাওয়া যায়, যা তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার চরম অবস্থার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবালগুলো ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণ সমুদ্রে টিকে থাকার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবাল প্রাচীর বহু প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল, যা মৎস্যসম্পদ ও পর্যটনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

gettyimages-2232729803

এই অঞ্চলের পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির ডলফিন, সামুদ্রিক কচ্ছপ, তিমি হাঙর ও সি স্নেক বসবাস করে। কিছু দ্বীপ কচ্ছপের ডিম পাড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান। গবেষণায় দেখা গেছে, তেল ছড়িয়ে পড়লে কচ্ছপ সরাসরি মারা যেতে পারে। এ ছাড়া উপকূলজুড়ে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন, যা সাধারণত তেল দূষণ সহ্য করতে পারে। তবে শ্বাসমূল ঢেকে গেলে এই গাছও মারা যেতে পারে। 

অন্যদিকে আবুধাবির কাছাকাছি সমুদ্রঘাসের এলাকায় ডুগংয়ের বড় একটি জনসংখ্যা বাস করে, যা তেল দূষণে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল শুধু পানির ওপর ভেসে থাকে না, বরং ঢেউয়ের কারণে ছোট ছোট কণায় ভেঙে সমুদ্রের গভীরেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে থাকা হাজারো রাসায়নিক উপাদান পানিতে মিশে যায়। মাছ ফুলকার মাধ্যমে এসব রাসায়নিক গ্রহণ করে, আর প্রবাল সরাসরি শরীরে শোষণ করে। পানির ওপরে থাকা তেল ডলফিন, কচ্ছপ বা সাপের মতো প্রাণীদের জন্য বিপজ্জনক, যারা শ্বাস নিতে উপরে আসে।

এই রাসায়নিকগুলো প্রাণীদের দৃষ্টি, ঘ্রাণ ও পরিবেশ বোঝার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তেলের সংস্পর্শে মাছের প্রজনন ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। সব মিলিয়ে, তেলের প্রভাব সরাসরি প্রাণঘাতী না হলেও ধীরে ধীরে প্রাণীদের আয়ু কমিয়ে দেয় এবং তাদের আচরণে পরিবর্তন আনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রাণীর ক্ষতি পুরো বাস্তুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, প্রণালীতে যত বেশি জাহাজ আটকে থাকবে, তত বেশি তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। আর এতে এই সমৃদ্ধ সামুদ্রিক পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

সূত্র : সিএনএন

আরটিভি/এসআর

 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission