গত ১২ মাসে পাকিস্তানি রুপির বিপরীতে ভারতীয় রুপির নজিরবিহীন দরপতন ঘটেছে। ২০১৫ সালের মে মাসে টানা ৮৮ ঘণ্টার 'অপারেশন সিঁদুর' শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যখন যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়, তখন থেকেই এই দরপতনের শুরু। এমনকি এই সময়ে বাংলাদেশি টাকার বিপরীতেও ভারতের মুদ্রা দুর্বল হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৫ মে প্রতি ভারতীয় রুপির বিপরীতে পাকিস্তানি রুপির দর ছিল ৩.২৯১৩। ২০২৬ সালের ১৮ মে সেই দর নেমে দাঁড়িয়েছে ২.৯০১০ পাকিস্তানি রুপিতে। অর্থাৎ এই সময়ে ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ১১.৮৬ শতাংশ—এর মধ্যে কেবল ২০২৬ সালেই দর কমেছে ৬.৮ শতাংশ।
মুদ্রার এই তীব্র দরপতন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কেবল বিশ্ববাজারে ডলারের শক্তিবৃদ্ধি বা পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধপরিস্থিতির কারণেই নয়। বরং এই তথ্য নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মৌলিক দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
২০২৫ সালে এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা মুদ্রা ছিল ভারতীয় রুপি। চলতি বছরেও ভারতীয় রুপিই এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ মুদ্রা।
শুধু পাকিস্তানি রুপিই নয়, এই সময়ে বাংলাদেশি টাকার বিপরীতেও ভারতের মুদ্রা দুর্বল হয়েছে। প্রতি রুপিতে টাকার দর ১.৪২ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১.২৮ টাকা। অর্থাৎ টাকার বিপরীতে এক বছরে ভারতীয় রুপির দর কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।
মোদি সরকার অবশ্য রুপির এই দুর্বলতার দায় বরাবরই আন্তর্জাতিক চাপ এবং পশ্চিম এশিয়ার সংকটের ওপর চাপিয়ে আসছে। কিন্তু পাকিস্তানি মুদ্রার বিপরীতে রুপির এই ধারাবাহিক পতন ইঙ্গিত দিচ্ছে, সমস্যাটি ভারতের অভ্যন্তরীণ। মুদ্রার এই অবমূল্যায়ন যদি কেবল বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি বা ডলারের দাপটের কারণে হতো, তবে এই অঞ্চলের বাকি সব মুদ্রার ওপরও এর প্রভাব সমভাবে পড়ত।
উদীয়মান অর্থনীতির অন্যান্য দেশগুলোও একই ধরনের আন্তর্জাতিক ধাক্কার মুখে পড়লেও পাকিস্তানি রুপির বিপরীতে তাদের মুদ্রার এমন দরপতন ঘটেনি।
এই দরপতনের শুরু হয় সামরিক সংঘাত ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের হাত ধরে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি কেটে যাওয়ার পরও এই ধারা থামেনি। এ ঘটনা ভারতের অর্থনীতিতে কাঠামোগত দুর্বলতার তত্ত্বকেই জোরালো করছে।
মোদি ও তার সরকারের ওপর ক্রমবর্ধমান অনাস্থা নিয়ে সম্প্রতি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি)। সেখানেও রুপির এই পতনকে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশও বেশ কিছুদিন ধরে দাবি করছেন, রুপির এই দরপতনের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দায়ী নয়। উদাহরণস্বরূপ, মার্চে জাপানি ব্যাংক এমইউএফজি এক নোটে জানায়, পশ্চিম এশিয়ার সংকট যেদিকেই মোড় নিক না কেন, চলতি বছরের শেষপর্যন্ত রুপির দরপতন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই প্রবল। আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ কেবল এই পতনের গতিকে কিছুটা কম বা বেশি করতে পারে, কিন্তু পতন রুখতে পারবে না।
আরটিভি/এসএস



