যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদে ভয়াবহ হামলা নিয়ে যা জানা গেলো 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬ , ০৬:৪৩ পিএম


যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদে ভয়াবহ হামলা নিয়ে যা জানা গেলো 
ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে সস্প্রতি সক্রিয় বন্দুকধারীর উপস্থিতির খবর পেয়ে দ্রুত অভিযান চালায় পুলিশ। ছবি: জোয়ি মেয়ার্স / এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ডিয়েগো শহরের বৃহত্তম মসজিদ 'ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো'তে (আইসিএসডি) এক ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় মসজিদের নিরাপত্তারক্ষী ও দুই মুসল্লিসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন এই ঘটনাটিকে ‘হেট ক্রাইম’ বা ঘৃণা থেকে উদ্ভূত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের। 

সান ডিয়েগোর পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, নিহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজন জোহরের নামাজের প্রস্তুতি নিতে আসা সাধারণ মানুষ ও মসজিদের নিরাপত্তাকর্মী। বাকি দুজন ১৭ ও ১৮ বছর বয়সী সশস্ত্র হামলাকারী কিশোর। মসজিদে ব্যাপক গুলি চালানোর পর তারা নিজেদের গুলিতেই আত্মহত্যা করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করছে পুলিশ।

সান ডিয়েগোর পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াহল বলেন, স্থানীয় সময় সোমবার (১৮ মে) দুপুরের দিকে ক্লিয়ারমন্ট এলাকায় অবস্থিত ওই উপাসনালয়ে অতর্কিত এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে এক সন্দেহভাজনের মা পুলিশকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তার ছেলে নিখোঁজ এবং বাড়ি থেকে বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ও একটি গাড়ি উধাও রয়েছে। পুলিশ যখন ওই কিশোর ও তার বন্ধুকে খুঁজছিল, ঠিক তখনই মসজিদ থেকে জরুরি সেবা ৯১১ নম্বরে আতঙ্কের কল আসে। 

নিকটস্থ পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। পুলিশ প্রধান আরও জানান, মসজিদের দুই ব্লক দূরে চলন্ত গাড়ি থেকেও গুলির খবর পাওয়া যায়। সেখানে এক পথচারী অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান। নিহতদের মধ্যে একজন মসজিদের নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন, যিনি সাহসিকতার সঙ্গে হামলাকারীদের পথরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। তার এই আত্মত্যাগ আরও বড় ধরনের প্রাণহানি ঠেকিয়েছে এবং মসজিদের স্কুল ভবনে থাকা শিশুরা নিরাপদ রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা এবং সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় বার্ষিক হজযাত্রার ঠিক এক সপ্তাহ আগে এই হামলার ঘটনা ঘটলো।

মসজিদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এটি সান ডিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় মসজিদ, যেখানে ৫ হাজারের বেশি মুসল্লি নিয়মিত আসেন।

কমপ্লেক্সটিতে আল-রশিদ স্কুলও রয়েছে, যেখানে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ ও কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য সান ডিয়েগোর মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণ করা এবং একই সঙ্গে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সহায়তা ও শিক্ষা দেওয়া।

মসজিদ কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার খুতবা, শিক্ষামূলক আলোচনা ও কমিউনিটি সেমিনার আয়োজন করা হয় এবং সব ধর্মের মানুষকে স্বাগত জানানো হয়।

এদিকে, সোমবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে সান ডিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়া বলেন, ‘বর্তমানে হুমকি মোকাবিলা করা হয়েছে এবং শিশুরা নিরাপদ আছে। তবে সান ডিয়েগোর এই পবিত্র ইসলামিক সেন্টারে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমাদের স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আমার গভীর সমবেদনা রইল।’ 

পরে অন্য এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র আরও বলেন, ‘সান ডিয়েগোতে ঘৃণার কোনো জায়গা নেই। ইসলামবিদ্বেষের কোনো স্থান এখানে হতে পারে না।’

স্থানীয় শার্প মেমোরিয়াল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় আহত আরও কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ এখনও তিন নিহতের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে কমিউনিটি নেতারা নিরাপত্তাকর্মীর নাম আমিন আব্দুল্লাহ বলে শনাক্ত করেছেন। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি আট সন্তানের জনক ছিলেন।

মসজিদের ইমাম এবং পরিচালক তাহা হাসানে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি ইবাদতের ঘর, কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। আমাদের সমাজে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক ঘৃণা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সহনশীলতা ও ভালোবাসার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।’

কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এই জঘন্য সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গেভিন নিউসাম ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও এই হামলার বিষয়ে ব্রিফ করা হয়েছে এবং তিনি একে একটি ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সান ডিয়েগোর এই নৃশংস ঘটনার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে লস অ্যাঞ্জেলেস এবং নিউ ইয়র্ক সিটির পুলিশ বিভাগ নিজ নিজ শহরের বিভিন্ন মসজিদ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

উল্লেখ্য, মার্কিন অধিকারকর্মীরা বহু বছর ধরে ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। তারা এর পেছনে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি, তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী আন্দোলন এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধকে ঘিরে উত্তেজনাকে দায়ী করছেন।

সিএআইআর জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তারা ৮ হাজার ৬৮৩টি মুসলিমবিরোধী ও আরববিরোধী অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে, যা ১৯৯৬ সালে তথ্য প্রকাশ শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ।

এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা মুসলিমরা ক্রমেই সরকারি নীতি, রাজনৈতিক বক্তব্য ও জনসন্দেহের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।

এদিকে, এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে রিপাবলিকান রাজনীতিকদের মধ্যে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অধিকারকর্মীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মসজিদ, ইসলামিক স্কুল ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে হুমকি ও হামলার ঘটনাও বেড়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।

আরটিভি/এআর 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission