নরওয়ের শীর্ষস্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে একটি কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, নরেন্দ্র মোদি একজন সাপুড়ে এবং তিনি বিন (বাঁশি) বাজাচ্ছেন। তার সামনে ঝাপি থেকে বেরিয়ে আছে একটি সাপ, তবে তার মাথা সাপের নয়। মাথাটি তেলের জ্বালানি পাম্পের পাইপ। মানে, যে অংশ দিয়ে তেল বের হয়।
সংবাদটির শিরোনামে মোদিকে চতুর এবং কিছুটা বিরক্তিকর মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
প্রশ্ন হলো, কেন এই কার্টুনসহ নিবন্ধটি প্রকাশ হলো। এর কারণ অনেক গভীর। এটিকে এখন মোদির বড় ধরণের ট্রল হিসেবে ধরা হচ্ছে, যা এখন ভাইরাল হয়ে গেছে। একইসঙ্গে, মোদি ভক্তরা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।
৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এ বছরও 'বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক' প্রকাশ করেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বা আরএসএফ। আন্তর্জাতিক এই সংগঠনের সূচক অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে সূচকে শীর্ষ স্থানে আছে নরওয়ে। অন্যদিকে, ভারতের অবস্থান ১৫৭ তম। দেশটিতে সাংবাদিকদের ওপর অনলাইন হয়রানি, মামলা, কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং বিভিন্ন আইনের অপব্যবহারের কারণে সেন্সরশিপ বাড়ছে।
মোদি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন ২০১৪ সালে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদি সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। তার ১২ বছরের শাসনামলে দেশে তিনি একটিও সংবাদ সম্মেলন করেননি।
বিপরীতে, তার পূর্বসূরি মনমোহন সিং এবং ইন্দিরা গান্ধী সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর করতেন।
নরওয়ের দৈনিক দাগসাভিসেনের সাংবাদিক হেলে লিং সভেন্ডসেন মোদিকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তিনি গণমাধ্যমের প্রশ্ন নেন না?
একই দিনে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ভারতের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন করেন। মোদি কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান, আর মন্ত্রী অসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কথা বলে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং পরে দৃশ্যত রেগে যান।
নরওয়েজিয়ান সংবাদ সম্মেলনে যা ঘটেছিল
সোমবার (১৮ মে) মোদি এক্স-এ লেখেন, তিনি (মোদি) নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী স্টোরের সঙ্গে প্রেস মিট করছেন।
কিন্তু তিনি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি।
নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক হেলে লিং সভেন্ডসেন জিজ্ঞাসা করেন- প্রধানমন্ত্রী মোদি, বিশ্বের সবচেয়ে মুক্ত গণমাধ্যম থেকে কিছু প্রশ্ন নেবেন না কেন? তিনি কেবল সম্মেলন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। জানা যায়নি তিনি প্রশ্নটি শুনেছিলেন কিনা।
সভেন্ডসেন তার পিছু নিয়ে বাইরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন- আপনি কি আমাদের … [সরকারের] আস্থার যোগ্য?
কিন্তু এই প্রশ্নেরও কোনো উত্তর পাননি।
পরে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন- নরওয়েতে বিদেশি নেতারা এলে সাধারণত গণমাধ্যম প্রশ্ন করার সুযোগ পায়। আজ মোদির ক্ষেত্রে তা হয়নি, আগামীকালও হবে না।
তিনি বলেন, আমরা অবশ্যই আশা করিনি যে তিনি (মোদি) প্রশ্নের উত্তর দেবেন, কারণ তিনি সাধারণত তা করেন না। তবে চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব। আমি একটি নিরাপদ দেশ থেকে সাংবাদিকতা করি, তাই প্রশ্ন করতে সাহস না করলে কে করবে? আমি জানি, ভারতে আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
পরে একটি আলাদা সংবাদ সম্মেলনে সভেন্ডসেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি (ওয়েস্ট) সিবি জর্জকে ভারতের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন করেন এবং জিজ্ঞাসা করেন, কেন নরওয়ে ভারতকে বিশ্বাস করবে যখন সেখানে অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে।
জর্জ উত্তরে ভারতের অতীত নিয়ে কথা বলেন — দাবা কোথায় উদ্ভাবিত হয়েছে, শূন্যের ধারণা কোথায় উদ্ভূত হয়েছে, কোভিডকালে ভ্যাকসিন ও ওষুধ বিতরণ ইত্যাদি। তিনি বলেন, আমরা সেই সভ্যতার জন্য গর্বিত। যোগ… ভারতে আবিস্কৃত হয়েছে।
সভেন্ডসেন যখন বাধা দিয়ে মানবাধিকার প্রশ্নের উত্তর চান, তখন জর্জ দৃশ্যত রেগে গিয়ে বলেন, ভারত একটি সভ্যতার দেশ।
সূত্র: আল-জাজিরা
আরটিভি/এসএস




