যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)-এর সাবেক চেয়ারম্যান এবং আধুনিক মার্কিন অর্থনীতির অন্যতম স্থপতি অ্যালান গ্রিনস্প্যান ১০০ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার স্ত্রী ও এনবিসি নিউজের সংবাদদাতা আন্দ্রেয়া মিচেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, পারকিনসন রোগজনিত জটিলতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৮৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা ১৯ বছরেরও বেশি সময় ফেডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গ্রিনস্প্যান। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তার প্রভাব ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে অনেকেই তাকে মার্কিন অর্থব্যবস্থার ‘যন্ত্রের ঈশ্বর’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন।
১৯২৬ সালে নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া গ্রিনস্প্যানের শৈশব কেটেছে আর্থিক কষ্টের মধ্যে। তরুণ বয়সে তিনি একজন প্রতিভাবান সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন এবং বিখ্যাত জুলিয়ার্ড স্কুলে ক্ল্যারিনেট বাজানো শিখেছিলেন। পরে সঙ্গীতের জগৎ ছেড়ে অর্থনীতি অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন এবং দ্রুতই নিজেকে একজন মেধাবী অর্থনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, জেরাল্ড ফোর্ড ও রোনাল্ড রিগানের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে প্রেসিডেন্ট রিগান তাকে ফেডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ১৯৮৭ সালের ভয়াবহ শেয়ারবাজার ধস মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন গ্রিনস্প্যান। পরবর্তী সময়ে ১৯৯০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বর্ণযুগের অন্যতম নেপথ্য কারিগর ছিলেন তিনি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে সুদের হার কমিয়ে বাজারে গতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নেন গ্রিনস্প্যান। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করে তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকে পরিণত হন।
অর্থনীতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং ব্রিটিশ রানীর কাছ থেকে সম্মানসূচক নাইট উপাধিও পান।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচনারও মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে। সমালোচকদের মতে, দীর্ঘদিনের নিম্ন সুদের হার এবং সহজ ঋণনীতির কারণে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পেছনে তার নীতিরও ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে সাব-প্রাইম মর্টগেজ সংকটের প্রেক্ষাপটে তার মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক দর্শন প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
তবে নিজের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করতেও দ্বিধা করেননি গ্রিনস্প্যান। ২০০৮ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া এক সাক্ষ্যে তিনি স্বীকার করেন, মুক্তবাজারের স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত আস্থা রাখা তার একটি বড় ভুল ছিল।
ফেড থেকে অবসরের পরও অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি এবং যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের সিদ্ধান্ত ‘ব্রেক্সিট’র সমালোচনা করে আলোচনায় আসেন।
অ্যালান গ্রিনস্প্যানের মৃত্যুতে বিশ্ব অর্থনীতি একটি প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বকে হারালো, যার সিদ্ধান্ত ও নীতির প্রভাব কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনুভূত হয়েছে।
আরটিভি/এসকে




