ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় সাধারণ মানুষের বিশাল ঢল নেমেছে। সেখানে উপস্থিত লাখো মানুষের কান্না এবং আবেগ দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজের এই বিস্ময়ের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, সব সময় আমি ভেবেছিলাম ইরানের সাধারণ মানুষ তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হয়তো ঘৃণা করে। কিন্তু বাস্তবে মানুষের এই বিপুল ভালোবাসা দেখে আমি পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেছি।
অ্যাক্সিওসের পরিচিত সাংবাদিক বারাক রাভিদকে টেলিফোনে এই সাক্ষাৎকার দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। ট্রাম্প বেশ দম্ভের সঙ্গেই বলেন যে খামেনির জানাজায় উপস্থিত সবাইকে তিনি চাইলেই এক নিমিষে নির্মূল করে দিতে পারতেন। তার সামরিক বাহিনীর সেই সক্ষমতা ছিল। কিন্তু তিনি ভেবেচিন্তে ইচ্ছা করেই তা করেননি। কারণ হিসেবে তিনি জানান এমনটি করলে ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য ইরানে আর কেউ অবশিষ্ট থাকত না।
ট্রাম্প তার সাক্ষাৎকারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান খামেনির জানাজা ও শোক পালন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র । তিনি নিশ্চিত করেছেন যে জানাজা কার্যক্রম চলাকালে কোনো পক্ষই অপর পক্ষের ওপর নতুন করে কোনো সামরিক হামলা চালাবে না। এটি এক প্রকার অঘোষিত যুদ্ধবিরতির মতো কাজ করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর একটি ভয়াবহ যৌথ সামরিক হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল মিলে এই আকস্মিক হামলা চালায়। এই মারাত্মক হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রাণ হারান। শুধু তিনি একা নন তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও এই নির্মম হামলায় নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে খামেনির ১৪ মাস বয়সী এক ফুটফুটে নাতনিও রয়েছে। শিশুটির নাম জাহরা মোহাম্মদি গোলপায়েগানি। খামেনি এবং তার পরিবারের সদস্যদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে রাজধানী তেহরানে হাজারো মানুষের ঢল নামে। পুরো শহর যেন এক শোকের সাগরে পরিণত হয়।
শুক্রবার(৩ জুলাই) থেকে ইরানে টানা ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শুরু হয়েছে। শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তেহরানের সুবিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে জড়ো হন লাখো শোকাতুর ইরানি নাগরিক। মানুষের ভিড়ে সেখানে তিল ধারণের কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না।
শুক্রবার তেহরানের মূল অনুষ্ঠানস্থলে খামেনির মরদেহ নিয়ে আসা হয়। অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে তার মরদেহটি ইরানের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল। মরদেহের ঠিক ওপরেই তার ঐতিহ্যবাহী কালো পাগড়িটিও রাখা হয়।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল খামেনির কফিনের ঠিক পাশেই রাখা তার স্বজনদের কফিনগুলো। এর মধ্যে পতাকায় মোড়ানো শিশু জাহরার ছোট্ট কফিনটিও রাখা ছিল। কফিনের পাশে শিশুটির ফ্রেমে বাঁধানো একটি হাসিমুখের ছবিও রাখা হয়। এই দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত প্রায় সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। এত ছোট এক নিষ্পাপ শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু উপস্থিত জনতাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
শুক্রবার বিকেল থেকেই হাজার হাজার সাধারণ মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লা চত্বরের বাইরে ভিড় করতে শুরু করেন। শনিবার(৪ জুলাই) সকালে যখন মূল ফটক খুলে দেওয়া হয় তখন মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল এই চত্বরটি লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। চারদিকে শুধু মানুষের মাথা আর কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে সমবেত জনতার হাতে ছিল শিয়া সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী লাল রঙের পতাকা। এই লাল পতাকা মূলত চরম প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এ সময় সমবেত জনতা প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং ঘৃণা প্রকাশ করতে থাকেন। তারা আমেরিকা নিপাত যাক এবং আমরা প্রতিশোধ চাই বলে লাগাতার স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের তীব্র স্লোগানে পুরো তেহরান শহর যেন প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
ইরান এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রয়াত এই শীর্ষ নেতার কফিন পর্যায়ক্রমে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে টানা ছয় দিন ধরে এই বিশাল শোকযাত্রা এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কর্মসূচি পালিত হবে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে।
আরটিভি/এআর



