টানা বৃষ্টিতে গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন। এমন পরিস্থিতিতে বাবার কোনো খোঁজ না পেয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই বন্যার পানিতে ঝাঁপ দিলেন এক যুবক। ট্রাকের টায়ার ভাসিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা সাঁতরে তিনি পৌঁছে যান বাবা-মায়ের কাছে। চীনের দক্ষিণাঞ্চলের এই ঘটনা দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চীনের গুয়াংসি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণ ও কয়েকটি বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে অন্তত ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় চার লাখ মানুষ। গত ৩ থেকে ৬ জুলাই অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। আর কিনঝৌ শহরে রেকর্ড করা হয় ৮০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি।
এই দুর্যোগের মধ্যেই ৬ জুলাই ৩০ বছর বয়সী শিয়ে নামে এক যুবক এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বন্যার পানিতে নামেন। শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের গ্রামের বাড়িতে থাকা বাবা-মায়ের খোঁজ নিতে তাদের প্রায় তিন ঘণ্টা সাঁতার কাটতে হয়।
শিয়ে ও তার দুই ভাইবোন শহরে থাকলেও বাবা-মা গ্রামের বাড়িতেই বসবাস করেন। আগের রাতে তার মা ফোন করে জানান, ৬৩ বছর বয়সী বাবা আগেই কাটা ধান নিরাপদে রাখার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও আর ফিরে আসেননি। এরপর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
সারা রাত উৎকণ্ঠায় কাটানোর পর ভোরে এক বন্ধুকে নিয়ে রওনা দেন শিয়ে। পথে একটি দোকান থেকে দুটি ট্রাকের নতুন টায়ার কিনে নেন। উত্তাল স্রোতের মধ্যে ভেসে থাকার জন্য ওই টায়ারই ছিল তাদের একমাত্র অবলম্বন।
প্রবল স্রোতের কারণে শেষ এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। অবশেষে বাড়িতে পৌঁছে তারা দেখেন, দ্রুত বাড়তে থাকা পানির কারণে শিয়ের বাবা বাড়ির ওপরতলায় আটকা পড়ে আছেন।
ছেলেকে দেখে স্বস্তির হাসি দিলেও শিয়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল ক্ষোভ। কয়েক বস্তা ধান বাঁচাতে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার জন্য তিনি বাবাকে ভর্ৎসনা করেন। পরে বাড়ির পেছনের একটি সরু পথ দিয়ে বাবাকে নিরাপদে পাহাড়ের ওপর থাকা আরেকটি বাড়িতে নিয়ে যান।
এদিকে ভিজে কাপড়ে ছেলেকে ফিরে আসতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিয়ের মা। ছেলেকে নিরাপদে ফিরে পাওয়ার স্বস্তির পাশাপাশি নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলায় তাকেও বকাঝকা করেন তিনি।
বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর সেদিনই শহরে ফিরে যান শিয়ে। ফেরার পথেও তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা সাঁতার কাটতে হয়েছে। তিনি জানান, শহরে তার দুটি ব্যবসা রয়েছে। পাশাপাশি সেখান থেকে প্রয়োজন হলে গ্রামের জন্য উদ্ধার সহায়তার ব্যবস্থাও করা সম্ভব।
শিয়ে বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি ভালো সাঁতার জানেন। তবু বরফশীতল পানি ও তীব্র স্রোতের মধ্যে টানা তিন ঘণ্টা সাঁতার কাটা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর এবং ভীতিকর অভিজ্ঞতা।
নিজের এই অভিযানের কিছু ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি। ভিডিওটি প্রায় ২০ লাখবার দেখা হয় এবং ২০ হাজারের বেশি লাইক পায়। পরে প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘বিপজ্জনক আচরণ’ উল্লেখ করে ভিডিওটি সরিয়ে দেয়।
গুয়াংসির বন্যায় এমন মানবিক ঘটনার আরও কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এক ব্যক্তি নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছেও স্ত্রীর খোঁজে আবার বন্যার পানিতে ঝাঁপ দেন। অন্য এক ঘটনায় দেখা যায়, প্রবল স্রোতের মধ্যে দেয়াল আঁকড়ে ধরে নিজের পোষা কুকুরটিকে ভেসে যাওয়া থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন এক তরুণী। সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
আরটিভি/এমএইচজে




