মাদুরোকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে এবার নতুন নাম, মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ , ০৬:৫৭ পিএম


মাদুরোকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে এবার নতুন নাম, মিলল চাঞ্চল্যকর তথ্য
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ফাইল ছবি

ভেনেজুয়েলায় ঢুকে দুর্গের মতো প্রাসাদ থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার স্ত্রীসহ যেভাবে তুলে নিয়ে গেছে মার্কিন বাহিনী, তা নিয়ে এখনও অবাক পুরো বিশ্ব। মাদুরো যে গভীর এক ষড়যন্ত্রের শিকার, তা নিয়ে দ্বিমত নেই কারোরই। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে মাদুরোর কোন ঘনিষ্ঠজন সরাসরি কলকাঠি নেড়েছেন, তা নিয়ে এখন চলছে বিস্তর অনুসন্ধান। এসব অনুসন্ধানে এরই মধ্যে উঠে এসেছে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর নাম। তবে, এবার এই ষড়যন্ত্রে উঠে এসেছে এমন এক নাম, যা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন চাঞ্চল্য।    

বিজ্ঞাপন

নতুন তথ্য বলছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার আগেই নাটকীয় এক গোপন সমঝোতা হয়েছিল ওয়াশিংটন ও কারাকাসের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে। মাদুরোর অতিঘনিষ্ঠ ডেলসি রদ্রিগেজ ও তার ভাই যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, মাদুরো বিদায় নিলে সহযোগিতা করবেন তারা। 

সম্প্রতি প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার অন্দরমহলের সেই গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগের চাঞ্চল্যকর বিবরণ।

বিজ্ঞাপন

উচ্চপর্যায়ের চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, মাদুরোর জায়গায় গত ৫ জানুয়ারি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়া ডেলসি রদ্রিগেজ এবং তার ভাই জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজগোপনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের কর্মকর্তাদের জানান, মাদুরো বিদায় নিলে তারা সেটিকে স্বাগত জানাবেন।

আরও পড়ুন

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডেলসি রদ্রিগেজ যখন মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন থেকেই মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়। গত শরৎকাল থেকে এই আলোচনা চলছিল এবং নভেম্বরের শেষ দিকে ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের পর তা আরও জোরদার হয়। ওই ফোনালাপে ট্রাম্প মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা ছাড়তে বলেন, কিন্তু মাদুরো সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।

বিজ্ঞাপন

এরপর গত বছরের ডিসেম্বরে আলোচনায় যুক্ত এক মার্কিন কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে জানান, ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রকে বলেন, তিনি প্রস্তুত আছেন। তার ভাষায়, ‘ডেলসি বার্তা দিয়েছিলেন— মাদুরোর চলে যাওয়া দরকার’। আরেকজন বলেন, তিনি বলেছেন, ‘এরপর যা হবে, আমি সেটার সঙ্গে কাজ করব।’

সূত্রগুলো জানায়, প্রথমে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার সরকারপক্ষের লোকজনের সঙ্গে কাজ করতে অনাগ্রহী ছিলেন। তবে, পরে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, মাদুরোর বিদায়ের পর ভেনেজুয়েলার সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে ডেলসি রদ্রিগেজই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

আর তাই মাদুরোকে আটক করার আগে ডেলসি ও হোর্হে রদ্রিগেজ যে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন, সে তথ্য আগে প্রকাশ হয়নি। অক্টোবরে মায়ামি হেরাল্ড জানায়, কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া এক আলোচনায় ডেলসি রদ্রিগেজ প্রস্তাব দিয়েছিলেন— মাদুরো পদত্যাগ করলে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হবেন। তবে, সে আলোচনা ভেস্তে যায়। 

আরও পড়ুন

ব্রিটিশ সংবাদসংস্থা রয়টার্স গত রোববার জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রক দিয়োসদাদো কাবেলোও প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণের অভিযান শুরুর কয়েক মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন।

সব সূত্রই বলছে, ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সমঝোতায় একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা ছিল। মাদুরো বিদায় নিলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবেন— এ আশ্বাস দিলেও তাকে সরাতে সক্রিয়ভাবে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেননি।

অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প নিজেই ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে নিশ্চিত করেন। নিউইয়র্ক পোস্টকে তিনি বলেন, ডেলসি রদ্রিগেজ এই উদ্যোগে ‘সমর্থন দিয়েছেন’। তার ভাষায়, ‘আমরা তার সঙ্গে বহুবার কথা বলেছি। তিনি বোঝেন, সব বোঝেন।’

ডেলসি রদ্রিগেজের নিয়ন্ত্রণাধীন ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার এ বিষয়ে দ্য গার্ডিয়ানের প্রশ্নের জবাব দেয়নি এখনও। হোয়াইট হাউসও এ সম্পর্কিত প্রশ্নে নীরব।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, এই গোপন আলোচনার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন ও মাদুরো সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনাও চলছিল। ট্রাম্পের অভিষেকের মাত্র ১০ দিন পর মার্কিন বন্দিদের বিষয়ে আলোচনা করতে মাদুরো তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রিক গ্রেনেলের সঙ্গে দেখা করেন। পরে দ্রুতই কয়েকজন বন্দি মুক্তিও পায়।

আরও পড়ুন

সূত্র জানায়, ট্রাম্পের শীর্ষ সহকারীরা নিয়মিত ডেলসি ও হোর্হে রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলতেন— বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত ভেনেজুয়েলানদের প্রতি দুই সপ্তাহে ফ্লাইট চালানো, এল সালভাদরে আটক ভেনেজুয়েলানদের অবস্থা এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি নিয়ে সমন্বয়ের জন্য।

এদিকে কাতারের সঙ্গে ডেলসি রদ্রিগেজের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। কাতারের শাসক পরিবারের সদস্যরা তাকে বন্ধু হিসেবে দেখতেন বলে সূত্র জানিয়েছে। কাতার সম্প্রতি ট্রাম্পকে ব্যবহারের জন্য ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিলাসবহুল বিমান উপহার দেয়। কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়া নজিরবিহীন উপহার এটি। এই সৌহার্দ্য কাজে লাগিয়েই গোপন আলোচনায় ডেলসির জন্য আরও দরজা খুলে দেয় কাতার।

গত বছরের অক্টোবরে মায়ামি হেরাল্ড জানায়, ডেলসি প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে মাদুরো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার মাধ্যমে অবসর নিলে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেবেন। কিন্তু, সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং ডেলসি সংবাদটিকে তীব্র ভাষায় অস্বীকার করেন। তবে, অনেক মার্কিন কর্মকর্তা তখন বুঝতে শুরু করেন, ডেলসি আসলে কট্টর মতাদর্শিক নেত্রী নন। যারা তাকে কাছ থেকে চেনেন, তারা বলেন, ডেলসির কিছু ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সহজেই মানুষকে কাছে টানে। তিনি শ্যাম্পেন পান করেন, ব্যক্তিগত টেবিল টেনিস কোচ রাখেন এবং বিদেশি কূটনীতিকদের খেলায় চ্যালেঞ্জ করতে পছন্দ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল, মাদুরোর বিদায়ের পর যেন দেশটি অস্থিতিশীলতা বা গৃহযুদ্ধের দিকে না যায়। এরপর শরতের শেষ দিকে মাদুরোর অজান্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন আলোচনায় বসেন ডেলসি ও তার ভাই। এরপর নভেম্বর মাসে মাদুরো ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং পরের সপ্তাহেই স্পষ্ট হয়— তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন না।

অবশ্য ডেলসি রদ্রিগেজের জন্য বিষয়টি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে মাদুরোকে উৎখাতের প্রস্তাব দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে মাদুরোর সঙ্গে প্রকাশ্যে বিশ্বাসঘাতকতা করতেও রাজি হননি। মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি মাদুরোকে ভয় পেতেন’।

এরপর চলতি জানুয়ারি মাসের শুরুতে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার কারাকাসে ঢোকে, তখন ডেলসি রদ্রিগেজকে কোথাও দেখা যায়নি। একপর্যায়ে গুজব ছড়ায়, তিনি মস্কোতে পালিয়ে গেছেন। তবে দুই সূত্র জানায়, তিনি তখন ভেনেজুয়েলার পর্যটন দ্বীপ মার্গারিটায় ছিলেন।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission