কী করে বুঝবেন আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন?

আশরাফুল আলম আশিক

বৃহস্পতিবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৭ , ০৪:৪৮ পিএম


কী করে বুঝবেন আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন?

কোনো কোনো আঘাত আমাদের শক্ত করে তোলে, আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। আবার কিছু কিছু আঘাত আমাদের সামনের রাস্তা নতুন করে চলার আশা জোগায়। কিন্তু এমন কিছু কিছু  আঘাত আছে যা আমাদের শক্ত নয় বরং একদম বিধ্বস্ত করে দেয়। আর সেটা এমন কি আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়ায়। কোনো কেনো এমন অবস্থায় দাঁড়ায় যে মৃত্যু ছাড়া সে অন্য কিছুতে শান্তির কথা চিন্তাই করে না। আর সেই অবস্থা হলো বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন।

ডিপ্রেশন আসলে অদ্ভুত একধরণের ইমোশনাল ইলনেস এবং এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক অবস্থা দিন দিন অবনতি হতে থাকে । ডিপ্রেশন হলো  মানসিক রোগের মধ্যে সর্বাধিক কমন ও মহামারি রোগ। এটি এমন এক রোগ যার সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে অতিরিক্ত উদ্বিগ্নতা এবং বাধ্যতাধর্মী গোলযোগ।

ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে বিভিন্ন মাত্রায়, গভীরতায় ও পরিসরে। এ রোগটি প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন দুর্বিষহ ও অর্থহীন করে ফেলে। এমনকি মৃত্যুর মতো ভয়ানক চিন্তায়ও করে থাকে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ভেঙে পড়েন, হয়ে যান অলস,  নিস্তেজ, শক্তিহীন ও মানসিক ভারসাম্যহীন।

জানা যায় আমেরিকায় প্রতি ২০ জনে একজন মারাত্মক ধরনের ডিপ্রেশনে আক্রান্ত। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন তাদের জীবনে কখনো না কখনো ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হন।

ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা আসলে কী?

এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় বোঝানো সম্ভব না। ডিপ্রেশন খুবই সাধারণ কিন্তু মারাত্মক একধরণের মানসিক ব্যাধি যা আপনার অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা ও কাজকর্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা অনেক সময় দুঃখবোধ ও বিষণ্ণতাকে এক বলে মনে করি। এ দুটো কিন্তু এক নয়। দুঃখবোধ হলো সাময়িক মন খারাপ যা অল্প কিছু সময় পরেই ঠিক হয়ে যায়। এর জন্য কোন চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে, ডিপ্রেশন দীর্ঘকালীন সমস্যা। যা থেকে মুক্তি পাবার জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার ও পরামর্শের প্রয়োজন হয়ে থাকে।

ধরেন, আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠছেন বাসা থেকে বের হয়ে অফিসে যাচ্ছেন। সেখানে সহকর্মীদের সাথে কথা বলছেন, বসের সাথে মিটিং করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। তারপর আবার দিনশেষে বাসায় এসে স্বামী কিংবা স্ত্রীর সাথে কথা বলছেন, বাচ্চাদের সাথে খেলছেন, ঘুরছেন ইত্যাদি। ডিপ্রেশন আপনার এই দৈনন্দিন সক্ষমতাকে শেষ করে দেয়। আপনাকে আপনার দৈনন্দিন কাজ কর্ম থেকে দূরে ঠেলে দেয়। তাদের শরীর থাকে সুস্থ, কিন্তু তারা মনের বিরুদ্ধে ঘরের বাইরে বের হতে পারেন না। তারা তাদের শরীরকে মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে অফিসে নিয়ে যান, মিটিং করেন, সবার সাথে কথা বলেন ইত্যাদি। কিন্তু সে যেন বিরক্ত।  

তারপর একদিন আর এসবও পারেন না। আশে-পাশের মানুষের সাথেও কথা বলেন না। চুপচাপ ঘরের ভিতরে কাটান। তখন আমরা উনাকে অসামাজিক ভদ্রলোক অথবা ভদ্রমহিলা খেতাব দেই।  ডিপ্রেশনে ভুগছেন অনেক ব্যক্তিই জানিয়েছেন যে, তারা বুকের মধ্যে এক ধরনের ব্যাপক শূন্যতা অনুভব করেন। একদম নিরন্তর শূন্যতা। আর এই শূন্যতার অনুভূতিই সবচে’ ভয়ংকর। দীর্ঘসময় ধরে ধারণ করা এই শূন্যতাকে বুকের মাঝে আটকে রাখেন এরপর সেই ডিপ্রেসড মানুষই একদিন নিজেকে নিজেই বুঝান যে তার এই জীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন এবং সর্বশেষ আত্মহত্যার মাধ্যমে তার ভিতরের এই যন্ত্রণা একবারেই বন্ধ করে ফেলা সম্ভব। ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যার প্রবণতা তাই খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। 

কী করে বুঝবেন যে আপনি ডিপ্রেশনে ভুগছেন?

দেখা যায় আপনি প্রিয় কাজ গুলো থেকেও ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। মন বসে না সে কাজে অথবা অন্য কিছু করতেও মন চায় না। আবার দেখা যায় আপনার প্রিয় খাবার থেকেও মুখ সরিয়ে নিচ্ছেন। মন চাচ্ছে না আর খেতে। হয় বেশি খাবেন, না হয় কম খাবেন। তবে ডিপ্রেশনের অন্যতম লক্ষণ হলো অনিদ্রা। আপনি হাজার চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারবেন না। তাছাড়া অন্য সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা, কাজে অনীহা, সব বিষয়ে নেতিবাচক প্রভাব ইত্যাদি লক্ষণ যখন নিজের ভিতর দেখবেন তখনই নিশ্চিত হতে পারেন আপনিও ডিপ্রেশন রোগী।

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির একদম নির্দিষ্ট কোনো উপায় নাই। তবে কিছু উপায় আছে। আর এটা হলো নিজের সাথে যুদ্ধ। রুটিন মাফিক চলা, লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা, সঠিক সময়ে খাওয়া, অনিদ্রা দূর করা, ব্যায়াম করা, সর্বদা ইতিবাচক চিন্তা করা, আনন্দে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি নিয়মিত নিজে নিজে করতে পারলে অবশ্যই ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তবে কিছু কিছু পর্যায়ে এ রোগের চিকিৎসাও সম্ভব। এ ছাড়া মেডিটেশন কিংবা কাউন্সিলিং এর সাহায্যেও ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

তবে আশার কথা যে, ডিপ্রেশনের বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাও কিন্তু রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রাতারাতি বিষন্নতা মুক্ত হওয়া কখনোই সম্ভব নয় বরং এ জন্য ধৈর্য ধরতে হবে। মনোরোগ চিকিৎসককে সময় দিতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিষণ্নতার চিকিৎসায় বিষণ্নতা কমানোর ওষুধ ও সাইকোথেরাপি দু’ই প্রয়োজন পড়ে। কেবল ওষুধ প্রয়োগে এটি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না। এ জন্য চিকিৎসক যদি একটু সময় নিয়ে রোগীকে সাইকোথেরাপি দেন তবে দ্রুত নিরাময় সম্ভব।

আরকে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission