বিয়ের পর অনেক নারীর শরীরে ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায় এমন ধারণা সমাজে বেশ প্রচলিত। তবে এর পেছনে শুধু একটি নয়, বরং একাধিক শারীরিক, মানসিক ও জীবনযাপনগত কারণ কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের পর জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ এবং শারীরিক কার্যকলাপের পরিবর্তন নারীদের ওজন বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
নিচে তুলে ধরা হলো বিয়ের পর নারীদের ওজন বৃদ্ধির ১০টি সম্ভাব্য কারণ:
১. হরমোনের পরিবর্তন
বিয়ের পর অনেক নারীর দৈনন্দিন জীবন ও রুটিনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এর প্রভাবে শরীরের হরমোন নিঃসরণেও পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই হরমোনগত ওঠানামার কারণে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে ওজন বাড়তে শুরু করে।
২. নিজের প্রতি যত্নে গাফিলতি
বিয়ের আগে অনেকে শরীর ঠিক রাখতে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামে সচেতন থাকেন। কিন্তু বিয়ের পর সংসার, দায়িত্ব ও নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে সেই যত্নে ভাটা পড়ে। ফলে অনিয়মিত খাবার, জাঙ্ক ফুড ও কম শারীরিক পরিশ্রমের কারণে ওজন বাড়তে পারে।
৩. ঘুমের ঘাটতি
বিয়ের পর ঘুমের সময়সূচি ও অভ্যাসে পরিবর্তন আসে অনেকের। রাত জাগা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং অনিয়মিত ঘুম হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর ফলেও শরীরে বাড়তি মেদ জমার ঝুঁকি বাড়ে।
৪. রুচি ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
নতুন পরিবার, নতুন পরিবেশ এবং জীবনসঙ্গীর পছন্দের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে অনেক সময় নিজের খাদ্যাভ্যাস বদলে যায়। এতে স্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে তেল-চর্বিযুক্ত বা বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের পরিমাণ বেড়ে গেলে ওজনও দ্রুত বাড়তে পারে।
৫. বাইরে খাওয়ার প্রবণতা
নবদম্পতিরা অনেক সময় ঘরোয়া খাবারের চেয়ে রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুড বা স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার বেশি পছন্দ করেন। এই ধরনের খাবারে সাধারণত ক্যালরি, তেল, চিনি ও লবণের পরিমাণ বেশি থাকে, যা ওজন বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
৬. বয়সজনিত প্রভাব
বর্তমানে অনেক নারীর বিয়ের গড় বয়স ২৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। এই বয়সের পর শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) কিছুটা ধীর হয়ে যেতে পারে। ফলে আগের মতোই খাবার খেলেও শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার সম্ভাবনা থাকে।
৭. মানসিক চাপ বা স্ট্রেস
বিয়ের পর নতুন পরিবারে মানিয়ে নেওয়া, দায়িত্ব বেড়ে যাওয়া, সম্পর্কের সমন্বয়-এসব কারণে অনেক নারী মানসিক চাপে থাকেন। স্ট্রেসের প্রভাবে অনেকের খাবারের পরিমাণ বেড়ে যায় বা অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়, যা ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
৮. সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের চাপ
বিয়ের পর আত্মীয়-স্বজনের নিমন্ত্রণ, দাওয়াত, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে অংশগ্রহণ বেড়ে যায়। এসব অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়ার কারণে শরীরে বাড়তি ক্যালরি জমে ওজন বাড়তে পারে।
৯. শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া
বিয়ের আগে পড়াশোনা, চাকরি, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো বা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে অনেকে বেশি চলাফেরা করেন। কিন্তু বিয়ের পর অনেকের জীবন তুলনামূলক ঘরকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। টিভি দেখা, মোবাইল ব্যবহার বা দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসও ওজন বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখে।
১০. গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মের পর পরিবর্তন
বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে অনেক দম্পতি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। গর্ভাবস্থায় ওজন বাড়া স্বাভাবিক হলেও সন্তান জন্মের পর অনেক নারী ওজন কমানোর দিকে নিয়মিত মনোযোগ দিতে পারেন না। ফলে গর্ভাবস্থার বাড়তি মেদ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের পর ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি- নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, জাঙ্ক ফুড কম খাওয়া, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস,সন্তান জন্মের পর ধীরে ধীরে ফিটনেস রুটিনে ফেরা।
বিয়ের পর ওজন বাড়া কোনো “অবধারিত” বিষয় নয়। বরং এটি অনেকটাই নির্ভর করে জীবনযাপন, মানসিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তার ওপর। তাই সচেতন থাকলে এবং নিয়ম মেনে চললে বিয়ের পরও সুস্থ ও ফিট থাকা সম্ভব।
আরটিভি/এসকে




