কখনও কখনও আমরা সবাই কল্পনায় হারিয়ে যাই। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই কল্পনার জগৎই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান বাস্তবতা। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের বড় অংশ জুড়ে নিজের মাথার ভেতরই গল্প তৈরি করে চলে—চরিত্র, ঘটনা আর আবেগে ভরপুর এক সমান্তরাল জগৎ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থাকে বলা হয় অতিমাত্রায় কল্পনায় ডুবে থাকা বা ‘ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডে ড্রিমিং’। এতে আক্রান্ত মানুষরা কখনও কখনও দিনে ১০–১২ ঘণ্টাও কল্পনার জগতে কাটিয়ে দেন। তাদের গল্প বছরের পর বছর, এমনকি দশকজুড়েও চলতে থাকে। বাইরে থেকে বিষয়টি আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তবে এটি অনেকের জীবনকে জটিল করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলিন রস আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে কল্পনা করা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এটি সৃজনশীলতা, সহানুভূতি এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, বরং কল্পনাই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ২ থেকে ৪ শতাংশ মানুষ এই ধরনের সমস্যায় ভুগতে পারেন। অনেক সময় এটি শৈশবের একাকীত্ব, মানসিক আঘাত বা সামাজিক চাপের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কেউ কেউ বাস্তব জীবনের কষ্ট থেকে পালাতে কল্পনার জগতে আশ্রয় খোঁজেন।
এই অবস্থায় থাকা ব্যক্তিরা প্রায়ই দীর্ঘ সময় একা থাকেন, গান শোনেন বা বারবার একই ধরনের শারীরিক নড়াচড়া করেন, যা তাদের কল্পনার জগৎকে আরও গভীর করে তোলে। ফলে বাস্তব জীবন থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হয়—পড়াশোনা, কাজ বা সম্পর্ক সবকিছুতেই প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাস ধীরে ধীরে আসক্তির মতো রূপ নিতে পারে। কল্পনার জগৎ এতটাই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যে বাস্তব জীবন অনেক সময় ফিকে মনে হয়। ফলে অনেকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং পরে অপরাধবোধ ও হতাশায় ভোগেন।
তবে আশার কথা হলো, এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কল্পনার সময় কতটা কাটছে তা নজরে রাখা, নতুন শখ তৈরি করা, দীর্ঘ সময় একা না থাকা এবং মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা অনেকটাই সাহায্য করতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে মানসিক চিকিৎসা ও থেরাপিও কার্যকর ভূমিকা রাখে। লক্ষ্য থাকে কল্পনাকে পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং সেটিকে নিয়ন্ত্রণে এনে বাস্তব জীবনের সঙ্গে ভারসাম্য তৈরি করা।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কল্পনা নিজে সমস্যা নয়—সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সেই কল্পনা বাস্তব জীবনকে দখল করে নেয়। তাই সচেতনতা ও সঠিক সহায়তা থাকলে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/জেএমএ




