অনলাইনে কেনাকাটায় শীর্ষে যে বিভাগ

আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ , ১১:৫২ এএম


অনলাইনে কেনাকাটায় শীর্ষে যে বিভাগ
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস বা ই-কমার্স, গ্রাহকদের কেনাকাটার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনছে। এ ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগের প্রতি পাঁচজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে একজনেরও বেশি এখন অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনাকাটা করছেন। অন্যদিকে, এই তালিকায় সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল বিভাগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘আইসিটি অ্যাক্সেস অ্যান্ড ইউজ বাই হাউজহোল্ডস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস সার্ভে ২০২৪-২৫’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১৪.৪ শতাংশ মানুষ পণ্য কিনতে বা সেবা পেতে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করেন। ঢাকা বিভাগে এ হার ২১.৩ শতাংশ, যা দেশের সর্বোচ্চ। বিপরীতে বরিশাল বিভাগে হার সবচেয়ে কম, ৮.৭ শতাংশ।

জরিপ অনুযায়ী, অনলাইনে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় পোশাক, জুতা ও খেলাধুলার সামগ্রী। মোট অনলাইন কেনাকাটার ৭০.৩ শতাংশই এ খাতে। এরপর রয়েছে খাদ্য ও মুদি পণ্য (৩৪.৬ শতাংশ), ওষুধ (২১.০ শতাংশ), প্রসাধনী (১৭.৯ শতাংশ), আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রী (১০.৯ শতাংশ) এবং আইটি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য (৮.৭ শতাংশ)।

মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’। অনলাইন ক্রেতাদের ৮৬.৮ শতাংশ পণ্য হাতে পেয়ে মূল্য পরিশোধ করেন। এছাড়া ১৩.৯ শতাংশ বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করেন। ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন ৩.১ শতাংশ এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করেন মাত্র ১.১ শতাংশ।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোবাইল ফোন সংযোগ ১৮ কোটি ৬০ লাখ এবং ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ১২ কোটি ৯৬ লাখে দাঁড়িয়েছে।

জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা বেশি। পুরুষদের ১৭.৫ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করেন, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ১১.৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকার তুলনায় শহরের বাসিন্দারা অনলাইন কেনাকাটায় প্রায় দ্বিগুণ এগিয়ে রয়েছেন। শহরের ২০ শতাংশ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করলেও গ্রামের ক্ষেত্রে এই হার ১১.৮ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে চট্টগ্রামে ১৬.২ শতাংশ, খুলনায় ১৪.২ শতাংশ, রাজশাহীতে ১১.৭ শতাংশ, সিলেটে ১০.৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৯.৩ শতাংশ এবং রংপুরে ৯.২ শতাংশ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করেন।

বয়সভিত্তিক হিসাবে ২৫-৩৪ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি অনলাইন কেনাকাটা করেন। এ বয়সী জনগোষ্ঠীর হার ২৪.৭ শতাংশ। ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ১৯.৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার হার সবচেয়ে কম, ২.৬ শতাংশ।

শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ৪১.৪ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করেন। মাধ্যমিক পাস করা ব্যক্তিদের মধ্যে এ হার ১৯.৫ শতাংশ, প্রাথমিক পাস করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৮.৩ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীনদের মধ্যে ৩.৭ শতাংশ।

পেশাভিত্তিক হিসাবে বেকারদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার হার সবচেয়ে বেশি, ২৩.৯ শতাংশ। কর্মজীবীদের মধ্যে এ হার ১৮.৯ শতাংশ এবং কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ১০.৫ শতাংশ।

জরিপে আরও দেখা গেছে, অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়ে ১১.৪ শতাংশ ক্রেতা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ১১.৪ ও ১১.৫ শতাংশ; যা প্রায় সমান।

গ্রামের ক্রেতাদের ১১.৬ শতাংশ এবং শহরের ১১.৩ শতাংশ অনলাইন কেনাকাটায় ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগের ক্রেতারা। উভয় বিভাগেই এ হার ১৭.২ শতাংশ। সবচেয়ে কম ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন ঢাকা বিভাগের ক্রেতারা, যেখানে হার মাত্র ৬.৮ শতাংশ।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এ হার ১৬.৬ শতাংশ। এছাড়া ৩৫-৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১২.৩ শতাংশ, ৪৫-৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১২.১ শতাংশ এবং ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১০.৯ শতাংশ ক্রেতা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা ক্রেতাদের মধ্যে সমস্যার হার সবচেয়ে বেশি, ১৫.৫ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীনদের মধ্যে এ হার ৮.৮ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ১০.৮ শতাংশ।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে বেশি কাটতি পোশাক, জুতা এবং খেলাধুলার সামগ্রীর, যার গড় হার ৭০.৩ শতাংশ। তবে পণ্যভিত্তিক পছন্দে নারী ও পুরুষদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। নারীদের ক্ষেত্রে এই ক্যাটাগরির পণ্য কেনার হার যেখানে ৭৫.৩ শতাংশ, পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৬৬.৮ শতাংশ।

অন্যদিকে অনলাইনে খাদ্য ও মুদি পণ্য কেনাকাটায় পুরুষদের হার ৩৬.৩ শতাংশ এবং নারীদের ৩২.২ শতাংশ। ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও পুরুষরা এগিয়ে। এখানে পুরুষদের হার ২৪.৩ শতাংশ, নারীদের ১৬.২ শতাংশ।

অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে বড় অভিযোগ ‘অর্ডার অনুযায়ী সঠিক পণ্য না পাওয়া’। ভোগান্তির শিকার ক্রেতাদের ৫০.৭ শতাংশ এ অভিযোগ করেছেন। পুরুষদের মধ্যে এ হার ৪৯.৩ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৫২.৬ শতাংশ।

দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা ‘পণ্যের নিম্নমান’। এ অভিযোগ করেছেন ৪৪.৮ শতাংশ ক্রেতা। পুরুষদের মধ্যে এ হার ৪৪.৭ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ। এছাড়া ১৯.৩ শতাংশ ক্রেতা সময়মতো পণ্য হাতে না পাওয়ার বা ‘দেরিতে ডেলিভারি’র অভিযোগ করেছেন। পুরুষদের মধ্যে এ হার ২০.৩ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ১৭.৮ শতাংশ। অন্যদিকে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ৯.৭ শতাংশ ক্রেতা।

পণ্যের মান নিয়ে শহরের ক্রেতাদের অসন্তুষ্টি বেশি। শহরের ৪৮ শতাংশ ক্রেতা নিম্নমানের পণ্যের অভিযোগ করেছেন, যেখানে গ্রামে এ হার ৪০.৭ শতাংশ। তবে ভুল পণ্য বা অর্ডার অনুযায়ী ভিন্ন সামগ্রী পাওয়ার ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের চিত্র প্রায় একই। শহরের ৫০.৬ শতাংশ এবং গ্রামের ৫০.৭ শতাংশ ক্রেতা এই ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন।

পণ্য হাতে পাওয়ার বা ডেলিভারি পদ্ধতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ৫৫.৬ শতাংশ ক্রেতা নির্দিষ্ট কালেকশন পয়েন্ট বা পোস্ট অফিস থেকে নিজেদের পণ্য সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে, কুরিয়ার বা পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি ‘হোম ডেলিভারি’ বা ঘরে বসে পণ্য পেয়েছেন ৩০.৬ শতাংশ গ্রাহক।

এদিকে দেশের একটি বিশাল অংশ কেন এখনো অনলাইন কেনাকাটার বাইরে রয়েছেন। এর কারণও উঠে এসেছে এই জরিপে। অনলাইনে কেনাকাটা না করা ব্যক্তিদের সিংহভাগই (৭৫.৮ শতাংশ) সরাসরি দোকানে গিয়ে পণ্য দেখে বা যাচাই করে কিনতে পছন্দ করেন।

এছাড়া ৩৫.৮ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাদের অনলাইনে কেনাকাটার দরকার পড়ে না। প্রয়োজনীয় দক্ষতা বা জ্ঞানের অভাবে অনলাইনে কেনাকাটা করেন না ১২ শতাংশ মানুষ। আর ৩.৩ শতাংশ ব্যক্তি গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জরিপের ফলাফল বলছে, দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিকাশমান ভোক্তা অর্থনীতির সম্ভাবনার পাশাপাশি বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোরও স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে এ জরিপ।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission