একসময় পরিবারের আড্ডায় সবার কথা স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যেত। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই ধীরে ধীরে মনে হয়, আশপাশের মানুষগুলো যেন আস্তে কথা বলছে বা কথাগুলো পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে না। বারবার একই কথা শুনতে চাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়। তবে এটি শুধু অন্যের কথা বলার সমস্যা নয়, হতে পারে বয়সজনিত শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার এই অবস্থাকে বলা হয় প্রেসবাইকিউসিস। সাধারণত দুই কানেই এর প্রভাব পড়ে এবং এটি একদিনে নয়, দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রবণশক্তির এই সমস্যা শুধু কথা শুনতে বাধাই তৈরি করে না, সময়মতো চিকিৎসা না নিলে মানসিক সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কেন কমে যায় শ্রবণশক্তি?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কানের ভেতরের সূক্ষ্ম অংশ, শ্রবণ স্নায়ু ও শব্দ বোঝার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে। ফলে শব্দ শোনা গেলেও অনেক সময় কথার অর্থ পরিষ্কারভাবে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে শুধু বয়সই নয়, দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকা, কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং বংশগত কারণেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন জোরে গান শোনা, কলকারখানার শব্দ, অতিরিক্ত যানবাহনের আওয়াজ বা কর্মক্ষেত্রের উচ্চ শব্দ কানের ক্ষতি করতে পারে।
এছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের মতো সমস্যাও কানের ভেতরের রক্তপ্রবাহে প্রভাব ফেলে শ্রবণশক্তি কমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
বয়সজনিত শ্রবণশক্তি কমার শুরুতে অনেক সময় শব্দ শোনার চেয়ে কথা বোঝার সমস্যাই বেশি দেখা যায়।
যেমন—
- অন্যকে বারবার কথা বলতে বলা
- ভিড় বা কোলাহলের মধ্যে কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া
- টেলিভিশন বা মুঠোফোনের শব্দ আগের চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেওয়া
- নারী ও শিশুদের কণ্ঠস্বর বুঝতে কষ্ট হওয়া
- কানে শোঁ শোঁ বা ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ শোনা
- মনে হওয়া সবাই অস্পষ্টভাবে কথা বলছে
বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট, পারিবারিক অনুষ্ঠান বা জনসমাগমে এই সমস্যা বেশি বোঝা যায়।
শ্রবণশক্তি কমলে জীবনে প্রভাব
শুধু কথোপকথন নয়, এর প্রভাব পড়ে সামাজিক জীবনেও। অনেকেই কথা বুঝতে না পারার কারণে ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেন। এতে একাকীত্ব, মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—
- নিয়মিত কথা শুনতে বা বুঝতে সমস্যা হওয়া
- কোলাহলপূর্ণ জায়গায় কথা ধরতে না পারা
- দীর্ঘদিন কানে শব্দ হওয়া
- শ্রবণ সমস্যা দৈনন্দিন কাজে বাধা তৈরি করা
একটি সাধারণ শ্রবণ পরীক্ষা করেই সমস্যার মাত্রা ও কারণ জানা সম্ভব।
চিকিৎসায় কি ভালো হওয়া সম্ভব?
বয়সজনিত শ্রবণশক্তি কমে গেলে তা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সবসময় সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন উপায়ে এর প্রভাব কমানো যায়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র ব্যবহার, যোগাযোগের অভ্যাস পরিবর্তন এবং অন্য শারীরিক সমস্যার সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।
বর্তমান সময়ের শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র আগের তুলনায় অনেক ছোট ও উন্নত হয়েছে, যা অনেক মানুষকে আবার স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করছে।
শ্রবণশক্তি ভালো রাখতে যা করবেন:
শ্রবণশক্তি রক্ষায় কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ—
- দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দ এড়িয়ে চলুন
- প্রয়োজনে কানে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করুন
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- ধূমপান থেকে দূরে থাকুন
- নিয়মিত শ্রবণ পরীক্ষা করান
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে শ্রবণশক্তি কমা স্বাভাবিক হলেও এটিকে অবহেলা করা ঠিক নয়। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে যোগাযোগ দক্ষতা, আত্মনির্ভরতা এবং জীবনযাত্রার মান অনেকটাই ভালো রাখা সম্ভব।
আরটিভি/জেএমএ



