ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কথা বলে ওঠা অনেক মানুষেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। কেউ বিড়বিড় করেন, কেউ আবার স্পষ্ট বাক্য বলেন, এমনকি কেউ কেউ হেসেও ওঠেন। অনেকের বিশ্বাস, ঘুমের মধ্যে বলা কথাগুলো মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা গোপন সত্য বা অব্যক্ত ইচ্ছার প্রকাশ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন।
ঘুমের মধ্যে কথা বলা কোনো রোগ নয়, বরং এটি মানুষের ঘুমের একটি স্বাভাবিক আচরণ। শিশুদের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সের মানুষই ঘুমের মধ্যে কথা বলতে পারেন।
কেন কথা বলে মানুষ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের মধ্যে কথা বলাকে বলা হয় ‘সোমনিলোকুই’। এটি ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটতে পারে। কখনও পুরো বাক্য, কখনও অস্পষ্ট শব্দ, আবার কখনও হাসি বা চিৎকারের মতো শব্দও শোনা যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ঘুমের মধ্যে কথা বলেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি। প্রায় অর্ধেক শিশু ঘুমের মধ্যে কথা বলে।
আমেরিকান ঘুমবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ জেনিফার মার্টিনের মতে, বেশিরভাগ শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও এটি ফিরে আসতে পারে।
ঘুমের মধ্যে কি সত্যি কথা বেরিয়ে আসে?
অনেকের ধারণা, ঘুমের মধ্যে মানুষ মনের গোপন কথা বলে ফেলে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা।
গবেষকদের মতে, ঘুমের মধ্যে বলা কথার বেশিরভাগই অসংলগ্ন এবং এর সঙ্গে বাস্তব জীবনের গোপন সত্যের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের মধ্যে বলা প্রায় অর্ধেক কথাই স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। গবেষণায় রেকর্ড করা কথাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ছিল ‘না’।
শিশুদের মধ্যে বেশি কেন দেখা যায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মস্তিষ্ক তখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকে। ঘুমের বিভিন্ন ধাপ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াও তখন পুরোপুরি পরিণত হয় না। এ কারণেই শিশুদের মধ্যে ঘুমের মধ্যে কথা বলার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে কারণ কী?
গবেষণা অনুযায়ী, ঘুমের মধ্যে কথা বলার পেছনে বংশগত কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মধ্যে এই অভ্যাস দেখা যায়।
এছাড়া কিছু ঘুমজনিত সমস্যার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমের ব্যাঘাত বা অন্যান্য ঘুমসংক্রান্ত সমস্যার কারণে এ প্রবণতা বাড়তে পারে।
স্মৃতির সঙ্গে আছে সম্পর্ক?
গবেষকদের ধারণা, ঘুমের মধ্যে বলা কথাগুলো অনেক সময় সেই স্মৃতির অংশ হতে পারে, যা ঘুমের সময় মস্তিষ্ক প্রক্রিয়াকরণ করে।
অর্থাৎ, ঘুমের মধ্যে উচ্চারিত শব্দ বা বাক্য সব সময় সচেতন চিন্তা বা ইচ্ছার প্রতিফলন নয়, বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমেরই অংশ।
এটি কি উদ্বেগের কারণ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে কথা বলা ক্ষতিকর নয় এবং চিকিৎসারও প্রয়োজন হয় না।
তবে একই বিছানায় বা পাশে ঘুমানো মানুষের জন্য এটি কিছুটা বিরক্তিকর হতে পারে।
জেনিফার মার্টিনের পরামর্শ, কেউ ঘুমের মধ্যে কথা বলতে শুরু করলে তাকে আলতোভাবে স্পর্শ বা হালকা ধাক্কা দিলে অনেক সময় তা বন্ধ হয়ে যায়।
তাই ঘুমের মধ্যে কথা বললে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এটি সাধারণত মানুষের ঘুমের স্বাভাবিক আচরণ, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দেয় না।
আরটিভি/জেএমএ



