প্রযুক্তির কারণে ‘ফোন বডি’র শিকার আপনিও কি হচ্ছেন ?

লাইফস্টাইল ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬ , ১০:৪৯ পিএম


প্রযুক্তির কারণে ‘ফোন বডি’র শিকার আপনিও কি হচ্ছেন ?
ছবি: সংগৃহীত

আপনার ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইসগুলো আপনার অজান্তেই আপনার শরীরে নানা পরিবর্তন আনছে। তবে ভালো খবর হলো, এর প্রতিকার করার সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে কথা উঠলে আমরা সাধারণত মানসিক স্বাস্থ্যের কথাই বেশি চিন্তা করি। কিন্তু নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, কনিষ্ঠা আঙুলে ছোট একটি কড়া পড়েছে। ঠিক যে জায়গাটিতে ভর দিয়ে আমরা ফোন ধরি, সেখানেই এই কড়া। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলল যে ফোন শরীরের অন্যান্য অংশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে যে উত্তর পেয়েছি, তা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

সাম্প্রতিক বিজ্ঞান বলছে, আপনার স্মার্টফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস হয়তো আপনার ঘাড়ের আকার বদলে দিচ্ছে, দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি করছে, মোটর স্কিল বা স্নায়ু-পেশির দক্ষতা কমাচ্ছে এবং পেশির শক্তি হ্রাস করছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই জীবনযাপনের কারণে ত্বকে দ্রুত বলিরেখাও পড়ছে। আর এসব শারীরিক সমস্যার কারণে ভবিষ্যতে স্মৃতিভ্রম বা আরও জটিল কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রযুক্তি যেন আমাদের শরীরকে ধ্বংস করতে না পারে, সে জন্য এখনই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নিচে এমন কয়েকটি সমস্যার কথা ও তার প্রতিকার তুলে ধরা হলো:

মেরুদণ্ডের বিকৃতি বা ‘টেক নেক’

আপনি যদি এই লেখাটি ফোনে পড়ে থাকেন, তবে খুব সম্ভবত আপনি মাথাটি নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে আছেন। মাথার এই সামনের দিকে ঝুঁকে থাকা ভঙ্গি আপনার ঘাড়ের ওপর প্রায় ২৭ কেজি (৬০ পাউন্ড) পর্যন্ত বাড়তি চাপ ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি আপনার মেরুদণ্ডের ডিস্কের ক্ষতি করতে পারে, জয়েন্ট ও পেশি দুর্বল করতে পারে এবং এমনকি ফুসফুসের কার্যক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর একটি নামও দেওয়া হয়েছে: টেক নেক। এটি আপনার শারীরিক গঠন চিরতরে বদলে দিতে পারে।

যা করতে পারেন:

• চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বিশেষ কিছু ব্যায়াম করতে পারেন।

• ফোন চোখের সমান্তরালে রাখুন: স্ক্রিনটি আপনার চোখ বরাবর এবং মুখ থেকে এক হাত দূরত্বে রাখার চেষ্টা করুন। কম্পিউটারের মনিটরের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

• বিরতি নিন: প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর অন্তত ২০ মিনিটের জন্য স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিন।

ত্বকের সমস্যা ও ঘাড়ে বলিরেখা

সম্প্রতি নতুন একটি উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে—‘টেক নেক’ কি ঘাড়ে বলিরেখা পড়ার কারণ হতে পারে? যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের ফেলো এবং চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ জাস্টিন হেক্সটল বলেন, তাত্ত্বিকভাবে এটি যৌক্তিক। বারবার একই জায়গায় চাপ পড়লে বলিরেখা তৈরি হতে পারে। তাই সব সময় সামনের দিকে ঝুঁকে থাকা এবং ঘাড় ভাঁজ করে রাখা একটি বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।

তবে অনলাইনে বিক্রি হওয়া তথাকথিত টেক নেক স্কিন প্রোডাক্ট বা প্রসাধন সামগ্রী কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এর বাইরে স্মার্টওয়াচ ব্যবহারকারীদের ত্বকের সমস্যা নিয়েও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘড়ির নিচের অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ফাঙ্গাস বা অ্যালার্জি (একজিমা) হতে পারে।

যা করতে পারেন:

• স্মার্টওয়াচ মাঝে মাঝে খুলে রাখুন এবং ওই স্থানের ত্বক পরিষ্কার করুন।

• সারা দিন ঘড়ি পরে থাকতে হলে ত্বকে ভালো কোনো ‘ব্যারিয়ার ক্রিম’ বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।

দৃষ্টিশক্তি হ্রাস

কয়েক দশক ধরে মায়োপিয়া (কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখলেও দূরের জিনিস ঝাপসা দেখা) রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এর জন্য প্রযুক্তিকে দায়ী করাটা খুব সহজ। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির অপটোমেট্রি বিভাগের অধ্যাপক ডোনাল্ড মুটি বলেন, এর পেছনে প্রযুক্তির ভূমিকা থাকলেও তা একটু ভিন্নভাবে কাজ করে।

তাদের ২০ বছরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফোনের মতো কোনো কিছুর দিকে খুব কাছ থেকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে বরং ‘বাইরে সময় না কাটানো’ মায়োপিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। বাইরে সূর্যের উজ্জ্বল আলো চোখের রেটিনা থেকে ডোপামিন নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে, যা চোখের সুস্থ বিকাশে সহায়তা করে। প্রযুক্তি আমাদের বেশি সময় ঘরের ভেতরে কাটাতে বাধ্য করছে, আর এটিই পরোক্ষভাবে চোখের ক্ষতি করছে।

যা করতে পারেন:

• প্রতিদিন নিয়ম করে দিনের আলোতে ঘরের বাইরে কিছুটা সময় কাটান (তবে ক্ষতিকর রোদ এড়াতে সানগ্লাস ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন)।

• এটি শুধু চোখের জন্যই ভালো নয়, ভালো ঘুমের জন্যও সহায়ক।

হাতের মুঠোয় শক্তির অভাব

হাতের মুঠোয় ধরার শক্তি বর্তমানে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত। এক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তচাপের চেয়েও গ্রিপ স্ট্রেন্থ দিয়ে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি নিখুঁতভাবে অনুমান করা যায়। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই শক্তি কমে যাচ্ছে।

জার্মানির মেডিকেল ইউনিভার্সিটি অব লুসিটজ-এর মেডিকেল সোসিওলজির অধ্যাপক জোহানেস বেলার বলেন, কম্পিউটারভিত্তিক এবং বসে বসে কাজ করার প্রবণতা আমাদের শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে হাতের মুঠোর শক্তির ওপরও।

আরও পড়ুন

যা করতে পারেন:

• একটি টেনিস বল নিয়ে সর্বোচ্চ শক্তিতে চেপে ধরে ১৫-৩০ সেকেন্ড রাখার চেষ্টা করুন।

• হাতের কবজির বিশেষ ব্যায়াম করতে পারেন।

• সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত ব্যায়াম করুন বা জিমে যান।

হাত ও চোখের সমন্বয়ের অভাব (মোটর স্কিল)

প্রযুক্তি আমাদের ‘মোটর স্কিল’ বা সূক্ষ্ম কাজ করার শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব রেগেন্সবার্গের ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজি ও এডুকেশনের অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান সুগেট বলেন, প্রযুক্তি হয়তো আপনাকে স্ক্রিনে সোয়াইপ বা ক্লিক করার ক্ষেত্রে দক্ষ করে তুলছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে হাতের সূক্ষ্ম কাজের দক্ষতার ওপর এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও মারাত্মক, কারণ মোটর স্কিলের সঙ্গে শিশুদের মানসিক ও বুদ্ধিগত বিকাশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সুগেট সতর্ক করে বলেন, এর ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সমাজের বুদ্ধিগত অবনতি হতে পারে।

যা করতে পারেন:

• দৈনন্দিন জীবনে নিজের হাতে কাজ করার অভ্যাস বাড়ান।

• রান্না করা, ছবি আঁকা, হস্তশিল্প বা কাঠের কাজ করতে পারেন।

• কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখতে পারেন বা নিদেনপক্ষে বেশি বেশি নিজ হাতে লেখার অভ্যাস করুন।

আরটিভি/এমএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission