যে কারণে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সৃষ্টি

মো. মাসুম হোসেন ভূঁইয়া

রোববার, ২৮ আগস্ট ২০২২ , ০৮:০০ পিএম


যে কারণে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সৃষ্টি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হেরে যাওয়া দেশগুলোর ঘাড়ের ওপর বিপুল অংকের দেনা। ইউরোপের অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয়; দেশের অবকাঠামো বিধ্বস্ত। বিশ্বজুড়ে বিরাজমান এমন একটা অবস্থায় বিশ্বনেতাদের মনে হলো, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ভবিষ্যতে এভাবে আর হুমকির মুখে ফেলা যায় না। বাকিটা এখন ইতিহাস।

প্রেক্ষাপট:
প্রতিষ্ঠার পর আইএমএফ বর্তমানের মতো বৈশ্বিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতো না। তার উদ্দেশ্যও কিন্তু এমনটা ছিল না। বিশ্বনেতারা চেয়েছিলেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যকার যেসব সংঘাত থেকে যুদ্ধ ডেকে আনে সেগুলো নিরসনে কাজ করবে আইএমএফ। তাঁরা আরও চেয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক সমস্যা-সমাধানের একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম থাকুক। 

১৯১৮ থেকে ১৯৩৯ সাল; অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়কে ওয়ার পিরিয়ড বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যে সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির হালচাল ছিল অস্থিতিশীল। উল্লম্ফন মুদ্রাস্ফীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্যে সীমাবদ্ধতা, বিদেশি শেয়ারবাজারে ফটকাবাজি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক রিজার্ভে উত্থান-পতন, স্বর্ণের সংকট, মুদ্রামান কমে যাওয়া- বৈশ্বিক অর্থনীতি ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত ছিল। এ সমস্যা সমাধানে একটি বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। আইএমএফ-এর প্রতিষ্ঠাতারা স্বর্ণ বিনিময়কে আদর্শ মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করেন যা গোল্ড এক্সচেঞ্জ স্ট্যান্ডার্ড নামে পরিচিত (gold exchange standard)।

১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফা ভাবে রূপান্তরযোগ্যতা ডলারের সোনা থেকে সরিয়ে দেয়, ফলে ব্রেটন উডস চুক্তি শেষ হয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী সকল মুদ্রার জন্য ইউএসডি বিশ্ব-মুদ্রায় একমাত্র সমর্থন এবং রিজার্ভ মুদ্রার উৎস।

আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:
বিশ্ব অর্থনীতির উল্লিখিত এই টানাপড়েনের লাগাম ধরতে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস নামক স্থানে জাতিসংঘ মুদ্রা ও অর্থবিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে দুটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়: আইএমএফ এবং পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যাংক বা বিশ্বব্যাংক। 

সেই ব্রেটন উডস সম্মেলনে জন্ম হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংকসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান যেগুলো সম্মিলিতভাবে ব্রেটন উডস ইনস্টিটিউশনস নামে পরিচিত। অন্যতম লক্ষ্য, একটি বৈশ্বিক, সর্বজনীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক সংকটে একে অপরকে সাহায্য করা। 

ঐতিহ্যগতভাবে আইএমএফের প্রধান নির্বাচিত হন ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে; আর বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাচিত হন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। 

আইএমএফ কি?
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (International Monetary Fund) হলো জাতিসংঘ অনুমোদিত একটি স্বায়ত্তশাসিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। প্রধান কাজ হলো, বিভিন্ন দেশের মুদ্রানীতি এবং মুদ্রামানের হ্রাস-বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করে বাজার-স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। আইএমএফ-এর সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি-তে অবস্থিত।

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে ডিসেম্বর ২৯টি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক লেন-দেন ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য রাখার লক্ষ্য নিয়ে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এর ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপিত হয়। ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৮৯টি রাষ্ট্র এই সংস্থার কার্যক্রমের আওতাভুক্ত। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট আইএমএফ-এর সদস্য-পদ লাভ করে।

আইএমএফ-এর দুই ধরনের সদস্য দেশ রয়েছে। মূল সদস্য (Original Members): ব্রেটন উডস সম্মেলনে যেসব দেশ অংশগ্রহণ করেছিল এবং ১৯৪৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে যেসব দেশ সদস্য হতে রাজি হয়েছিল, তারাই হলো আইএমএফ--এর মূল সদস্য। আর এসব দেশ বাদে, বাকি সদস্য রাষ্ট্রগুলো হলো সাধারণ সদস্য (Ordinary Members)।

বিশ্বব্যাংক কি?
বিশ্বব্যাংক বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা। যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ঋণ ও অনুদান প্রদান করে। বিশ্বব্যাংকের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচন। সারা বিশ্বের ১৮৯টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর সদর দপ্তরও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন, ডিসি-তে অবস্থিত। সংস্থাটির আর্টিকেলস্ অব এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান নিয়ামক হলো- বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সহজতর করা এবং পুঁজির বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে বিশ্বব্যাংকের ১৩৬তম সদস্য হিসেবে সদস্য পদ লাভ করে।

দুইটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিশ্বব্যাংক গঠিত : পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যাংক (International Bank for Reconstruction and Development, IBRD) এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (International Development Association, IDA)। 

বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর চার সদস্যের মধ্যে একটি হলো ‘বিশ্বব্যাংক’। অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন, বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ গ্যারান্টি সংস্থা বা মিগা (Multilateral Investment Guarantee Agency) ও আইসিএসআইডি (International Centre for Settlement of Investment Disputes, ICSID)।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপ:
দ্য ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইবিআরডি): এ সংস্থাটি মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রসমূহকে ঋণ দেয়। তবে কখনো কখনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাকেও ঋণ দিয়ে থাকে।

দ্য ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ): ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আইডিএ। আইডিএ’র পুঁজির উৎস হলো বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের প্রদত্ত অনুদান। অনুন্নত রাষ্ট্রসমূহকে সুদ মুক্ত বা স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয় সংস্থাটি। 

দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি): এ উন্নয়ন সংস্থাটি বেসরকারি খাত নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করে। আর্থিক বিনিয়োগ, পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণ, ব্যবসায় বা সরকারকে পরামর্শদান ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে এ সংস্থাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সাহায্য করে।

দ্য ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটলমেন্ট অভ ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি): সংস্থাটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিনিয়োগের আইনি সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করে।

দ্য মাল্টিল্যাটেরাল ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি এজেন্সি (এমআইজিএ/মিগা): ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো উন্নয়নশীল দেশসমূহে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করে; ওই দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্যের হার কমানো ও জীবনমান উন্নয়ন ইত্যাদি নিশ্চিত করা।

মূলত আইবিআরডি এবং আইডিএ- প্রতিষ্ঠান দুটির সমন্বয়ে বিশ্বব্যাংক গঠিত। বাকি তিনটি সংস্থা বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ হলেও এগুলো আইনগত, ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন। মোট এ পাঁচটি সংগঠন একত্রে বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠী নামে (World Bank Group) পরিচিত।

আইএমএফ-এর নেতৃত্ব:
আইএমএফ-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক কমিটি হলো ‘বোর্ড অব গভর্নরস’। একজন মূল গভর্নর এবং প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের জন্য একজন করে পর্যায়ক্রমিক গভর্নর নিয়ে এই বোর্ড অব গভর্নরস গঠিত। অন্যদিকে সদস্য রাষ্ট্র তাদের নিজ নিজ গভর্নর নিযুক্ত করে। সদস্য দেশ থেকে সংস্থাটির গভর্নর বা মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণত উক্ত ব্যক্তি ওই সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হন। একইভাবে বাকি গভর্নরদেরকেও নিয়োগ দেওয়া হয়। বোর্ড মেম্বাররা বিভিন্ন বিষয়ে বাৎসরিক মিটিংয়ে একত্রিত হন। আইএমএফ-এর দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করেন ২৪ জন নির্বাহী পরিচালকের আরেকটি বোর্ড। এদের মধ্যে আট জন পরিচালক চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, রাশিয়া, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিযুক্ত হন। বাকি ১৬ জন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলভেদে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

কার্যনির্বাহী পরিষদ (Ministerial committees): বোর্ড অব গভর্নরসকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য দ্য ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল কমিটি (আইএমএফসি) এবং দ্য ডেভেলপমেন্ট কমিটি নামে দুটি কার্যনির্বাহী পরিষদ রয়েছে। ২৪ সদস্যবিশিষ্ট আইএমএফসি বছরে দুবার একত্রিত হয়ে অর্থনীতি সংক্রান্ত বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। এই কমিটি আইএমএফকে এর কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে থাকে। প্রতিবার মিটিং শেষে আলোচিত বিষয়ের সংক্ষিপ্তসার উপস্থাপন করে একটি যৌথ প্রজ্ঞাপন জারি করে থাকে। এই প্রজ্ঞাপনে পরবর্তী ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনার কথা উল্লেখ থাকে।

বিশ্বব্যাংক এর নেতৃত্ব:
বিশ্ব ব্যাংক এর প্রধান হচ্ছে প্রেসিডেন্ট এবং তিনি পুরো বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরিচালনা পর্ষদের সভা এবং ব্যাংকের সার্বিক ব্যবস্থাপনা প্রেসিডেন্টের উপর ন্যস্ত থাকে। ওইতিহ্যগতভাবে, বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট সবসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা মনোনীত এবং মার্কিন নাগরিক হয়ে থাকে। প্রেসিডেন্টের মেয়াদ হয় পাঁচ বছর।

আর বিশ্বব্যাংক ওর ভাইস প্রেসিডেন্ট হচ্ছে এর প্রধান ব্যবস্থাপক; যারা ব্যাংকের বিভিন্ন অঞ্চল, সেক্টর, নেটওয়ার্ক এবং কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব পালন করেন। ব্যবস্থাপনা পর্ষদে দু'জন নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট, তিনজন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ২৪ ভাইস প্রেসিডেন্ট রয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকের কাজ:
বিশ্বব্যাংকের উদ্দেশ্য হলো ধনী ও দরিদ্র রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা। বিশ্বব্যাংকের চেষ্টা থাকে ধনী রাষ্ট্রের সম্পদকে দরিদ্র রাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা। দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো, টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন।

* দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় কারণ, যুদ্ধ। তাই সদ্য যুদ্ধ থেকে মুক্তি লাভ করা দেশসমূহকে পুনর্গঠনে সাহায্য করে বিশ্বব্যাংক।
* মধ্যম আয়ের দেশসমূহকে দারিদ্রমুক্ত থাকার পথ দেখানো।
* জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে রাষ্ট্রসমূহকে সাহায্য করা।
* এইডস থেকে মুক্তি।
* মুক্তবাণিজ্য সম্প্রসারণ।
* স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করা; সুদ মুক্ত ধার দেওয়া; অনুদান প্রদান; শিক্ষা, অবকাঠামো ইত্যাদির উন্নয়ন; রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, কৃষি ইত্যাদি খাতের আধুনিকায়ন; প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজও করে থাকে বিশ্বব্যাংক।

আইএমএফ এর কাজ:
উন্নয়নশীল দেশগুলির সাথে সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন; দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করার জন্য নীতিমালা প্রদান; সদস্যদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে কাজ করে। এর কারণ, ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলো ত্রুটিপূর্ণভাবে কাজ করে। আবার অনেক দেশে আর্থিক বাজারগুলিতে প্রবেশাধিকার থাকে সীমিত। এ ধরনের বাজার অসম্পূর্ণতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পারিশ্রমিক অর্থনীতি (balance-of-payment financing) ব্যবস্থার উন্নতির জন্য আইএমএফ সরকারি অর্থায়নের ন্যায্যতা প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানটি বিকল্প অর্থায়নের যোগান দেয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর তিনটি অন্যতম কাজের একটি হলো- বিভিন্ন দেশের মধ্যে মুদ্রা বিনিময়-মূল্য তত্ত্বাবধান করা। যার মাধ্যমে দেশগুলো তাদের বিনিময়-হার নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।

সংক্ষিপ্তাকারে কাজসমূহের বিবরণ: 
আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা: অর্থ, পরামর্শ, মেধাশক্তি ইত্যাদি সরবরাহ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সমস্যাসমূহ সমাধান করা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে আর্থিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল সংস্থাটি।

বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা: সদস্য দেশগুলোর মুদ্রামান নির্ধারণ, বৈদেশিক মুদ্রার পারস্পরিক মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদি নিশ্চিত করার জন্য সুশৃঙ্খল বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক বৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বৃদ্ধি-সাধন করাটাও সংস্থার আরেকটি মৌলিক উদ্দেশ্য। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় বৃদ্ধি ও উন্নয়নের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো যেন উচ্চমাত্রায় আয় করতে পারে ও বেকারত্ব দূর করতে পারে তা নিয়ে কাজ করে আইএমএফ।

বিনিময় ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ দূরীকরণ: আইএমএফের আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে এ ধরনের দেশভিত্তিক আলাদা-আলাদা বিনিময়হার দূরীভূত করা বা সহজ করা; যাতে অবাধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ প্রশস্ত হয়।

বহুমুখী বাণিজ্য: দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জায়গায় বহুমুখী বাণিজ্য ব্যবস্থার বিকাশ নিয়ে কাজ করে আইএমএফ। 
ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি: সদস্য দেশগুলো বিশেষত অনুন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়ন পরিকল্পনায় সাহায্য করে।
পুঁজির বিনিয়োগ: আইএমএফ উন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে।
জরুরি সাহায্য: সদস্য কোনো দেশ যদি সাময়িক অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়, তাহলে সংস্থার জরুরি তহবিল থেকে ওই দেশকে সাহায্য করে।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য:
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে যথেষ্ট মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংক মূলত একটি উন্নয়ন সংস্থা। আর আইএমএফ একটি সমবায়মূলক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংকের সদস্য হতে হলে কোনো দেশকে আগে আইএমএফ-এর সদস্য হতে হয়। তবে দুটি সংস্থার উদ্দেশ্য ভিন্ন, গঠন আলাদা, আর পুঁজির উৎসও আলাদা। দুটো সংস্থাই নিজ নিজ স্বকীয় পন্থায় কাজ করে থাকে।

আকৃতিতে আইএমএফ বিশ্বব্যাংক এর চেয়ে ক্ষুদ্র। তবে বিশ্বব্যাংকের মতো এর কোনো অধীনস্থ শাখা বা অন্তর্ভুক্ত সংগঠন নেই। আইএমএফ এর কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর অধীনে প্রায় ৭০০০-এর মতো কর্মী কাজ করে। এসব কর্মীদের কাজের ধরন, কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রেও দুটি সংস্থার মাঝে ব্যাপক পার্থক্য।

সর্বোপরি জানিয়ে রাখি, উভয় সংস্থার দেওয়া শর্তসমূহ মেনেই কোনো রাষ্ট্রকে ঋণ নিতে হয়।

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission