সরকারি চাকরিক্ষেত্রে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণি পদমর্যাদার ঘোষণা আজ ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের মতো কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা ঘোষণা দেন। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কৃষিতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে আরও আগ্রহী হয়। বঙ্গবন্ধুর এ ঐতিহাসিক ঘোষণার দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে ২০১০ সাল থেকে কৃষিবিদরা এ দিনটিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউটের রূপান্তর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুবাদে এ দেশে উচ্চতর কৃষি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির প্রবর্তন ঘটে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের কৃষির উন্নয়নে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কাজ করে চলে এখানকার গ্র্যাজুয়েটরা। কিন্তু ওই সময় চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করতে পারলেও কৃষিবিদদের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করতে হতো। চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের মতো কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে ১৯৬৪ সালের ১৭ জুন থেকে ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয়, যা লাগাতার ভাবে ১৭২ দিন অব্যাহত থাকে। ৪৭ জন ছাত্র ও ৫ জন পথচারীকে এ আন্দোলনের দায়ে দীর্ঘ দিন জেল খাটতে হয়। মলয় বৈশ্য নামে একজন ছাত্রকে আত্মাহুতি দিতে হয় এ আন্দোলনে। স্বাধীনতার পর কৃষিবিদদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দেয়ার ঘোষণা দেন।
কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা ঘোষণা কালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আন্দোলন করছিস বলে আমি দাবি মেনে নিলাম তা নয়, আমি চাই ভালো ছাত্রছাত্রী কৃষি পড়ুক’ আমি তোদের দাবি মেনে নিলাম তোরা আমার মুখ রাখিস।’ বঙ্গবন্ধু সে ঘোষণা কৃষিবিদরা কতটুকু রক্ষা করতে পেরেছে- এ নিয়ে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে এটি জোর দিয়ে বলা যায়, কৃষিবিদদের প্রাপ্তির পাল্লা অন্য যে কোন পেশাজীবী থেকে অনেক অনেক বেশি। আমি কেন, আজ সবাই একবাক্যে স্বীকার করছে, বর্তমান সময়ে এ দেশের উন্নতির জন্য বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত কৃষিবিদরাই বেশি অবদান রেখেছেন এবং রেখে চলছেন। কৃষিবিদ দিবসে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর শীর্ষে থাকা খাদ্য উৎপাদন তথা দেশ উন্নয়নের কতটা সফলতা অর্জন করতে পেরেছি কৃষিবিদরা, তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
ছোটবেলা থেকে চাষের কাজে হাত লাগিয়েছি। শুরুটা ছিল এরকম, জমিতে মই দেওয়ার সময় বেশি ওজন দেওয়ার প্রয়োজন হলে, দুই পায়ের ফাঁকে মই এর মধ্যখান বসাত। সে সময় গরুর হাল, লাঙ্গল, জোয়াল, মই, ঢেঁকি ছিল কৃষকদের প্রধান সম্বল। বেশিরভাগ ফসলের চাষ হতো স্থানীয় পদ্ধতিতে ও অনুন্নত জাতের বীজ দিয়ে। ফলে উৎপাদন কম হতো। মূলত কৃষকদের ফসল চাষই ছিল প্রকৃতি নির্ভর। ধান, পাট, সীমিত পরিসরে ডাল, রবিশস্য, আখ ছিল চাষাবাদের আওতায়। সবজি, ফল বা মসলা জাতীয় ফসলের বাণিজ্যিক আবাদ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ধান, গমসহ বিভিন্ন ফসল কাটার জন্য কাস্তেই ছিল প্রধান হাতিয়ার।
বর্তমানে কৃষকের আর ঘাম ঝরাতে হয় না। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়ালেও গরুর গাড়ি, লাঙ্গল-জোয়াল, মই চোখে পড়বে না। ঢেঁকি তো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। এসব যান ও যন্ত্রের পরিবর্তে এখন কমবেশি সব কৃষকের বাড়িতেই দেখা যায় পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, হারভেস্টার, মিনি রাইস মিলসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি। সকল কাজেই এখন কৃষকরা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষিতে আধুনিক উপকরণ ব্যবহারের ফলে ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি সময় ও শ্রম দু’টিই কমেছে কৃষকের। আর এ কাজে সহায়তা করছে কৃষি বিভাগ। আসলে, কৃষিতে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বুঝতে পারলাম, এ দেশের মানুষকে সত্যিকার অর্থে কোনো পেশার লোক যদি বেশি কিছু দিয়ে থাকে, তারা হল কৃষিবিদ। ৭ কোটি মানুষের দেশে খাদ্যের অভাব ছিল, আজ ১৭ কোটি মানুষ ভালোমতোই খেতে পারছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষিবিদ পেশাজীবীদের সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়ার দিন থেকে ৫০ বছর দূরত্বে দাঁড়িয়ে যদি পর্যালোচনা করি- তা হলে সহজেই উপলব্ধি করতে পারব বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্তটি কতটা যুগান্তকারী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিল। সেই থেকে এ দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ফসলের শত শত জাত উদ্ভাবন ও প্রবর্তন এবং উন্নত চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ, গম দুই গুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। খাদ্যশস্য, মাছ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বাংলাদেশ ব্যাংক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ১৩টি খাতে বিশ্বের শীর্ষ দশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান জানা গেছে। ১৩ খাতে বিশ্বের শীর্ষ দশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম এখন জ্বলজ্বল করছে। এর মাঝে ১০টিই কৃষি খাত। এখন বাংলাদেশ সারাবিশ্বে চাল উৎপাদনে তৃতীয়, ইলিশে প্রথম, সবজিতে তৃতীয়, আলুতে ষষ্ঠ, কাঁঠালে দ্বিতীয়, আমে অষ্টম, পেয়ারায় অষ্টম, পাট রপ্তানিতে প্রথম ও উৎপাদনে দ্বিতীয়, ছাগলের দুধে দ্বিতীয় এবং মিঠাপানির মাছে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান হলো সবার উপরে। আলু উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। মাছ রপ্তানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আর কৃষির এই সার্বিক কর্মযজ্ঞের পিছনে বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছে কৃষিবিদরা। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুবাদে কৃষিবিদরা এ দেশে আজ এক মর্যাদাবান পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত। কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণা ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে দেশ আজ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের জন্য পথিকৃৎ।
এসব সম্ভব হয়েছে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এখন পর্যন্ত ১১১ টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। পরমাণু শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের মোট ১১৯ টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে এবং দেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলছে। এছাড়া বিনা সাফল্যের সঙ্গে উদ্ভাবন করেছে শিম, ডাল ও তেলজাতীয় আটটি ফসলের জন্য জীবাণু সার, যা মাটির গুণাগুণ রক্ষাসহ ডাল ও তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেন সারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
দেশের জলবায়ু ও কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৬২৫ টি উচ্চ ফলনশীল জাত এবং ৬২৬ টি ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তিসহ মোট ১ হাজার ২ শত ৫১ টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ডাল, তৈলবীজ, সবজি, ফলের ১০ হাজারের অধিক কৌলি সম্পদ (জার্মপ্লাজম) জিন ব্যাংকের মাধ্যমে সংরক্ষণ করছে। পাটজাতীয় ফসলের ৫০ টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যার মধ্যে দেশী পাট ২৫ টি, তোষা পাট ১৮ টি, কেনাফ চারটি ও মেস্তা তিনটি। এছাড়া সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ৪৬টি জাত অবমুক্ত করেছে। এর বাইরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো গবেষণা করে বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করেছে।
বাংলাদেশের গবেষকরা বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এতগুলো প্রতিকূল পরিবেশ সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ দেশ। আমাদের সকলের জানা বর্তমান সময়ে কৃষি প্রযুক্তি প্রসারে যুক্ত হয়েছে ই-কৃষি। কৃষি সমস্যা সমাধানে মোবাইল এ্যাপস ব্যবহার করে বাড়ি থেকে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাচ্ছে গ্রামের কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে স্থাপিত ‘কল সেন্টার’ থেকে টেলিফোনে কৃষকদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও কৃষিপণ্য বিপণনে ই-কমার্স উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে কোরবানির পশু, শাকসবজি এবং ফলমূলও বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে এখন সারাবছর বাজারে সবজি পাওয়া যায়, যা কয়েক বছর আগেও ছিল অবাস্তব। এখন গ্রীষ্মকালীন শিম, গ্রীষ্মকালীন টমেটোসহ আরো অন্যান্য সবজি উৎপাদনে ব্যাপকভাবে এগিয়েছে বাংলাদেশ। এতে পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আর্থিক লাভবান হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক। লবণাক্ত সহিষ্ণু, খরা সহিষ্ণু, জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু, সুগন্ধি ও বিশেষ ভিটামিন সমৃদ্ধ আধুনিক উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত কৃষিবিদদের অবদান। এছাড়াও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন লাভজনক বিদেশি ফসলকে দেশের আবহাওয়ার সাথে মানানসই করে চাষাবাদ উপযোগী করতে ফসল অভিযোজন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষি গবেষকগণ।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, কৃষিবিদরা কি করে? কৃষিবিদরা কৃষির উন্নয়নের জন্য গবেষণা করে। গবেষণা থেকে উদ্ভাবিত হয় নতুন প্রযুক্তি। আর সে প্রযুক্তি মাঠে সম্প্রসারণও করেন কৃষিবিদরা। কৃষিবিদদের হাতেই সৃষ্টি হয় ফসলের নতুন জাত কিংবা ফসলের উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি। শুধু ফসল কেন, ফসলের পাশাপাশি গবাদিপশুর উন্নয়ন, দুধের মান ও পরিমাণ বাড়ানো, মাংসের জন্য উন্নত জাতের পশুপালন প্রযুক্তি, বিভিন্ন ধরনের মাছের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি খামারের বিভিন্ন প্রকার যান্ত্রিকী করণ, কিংবা কৃষির সব ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ- এ সবই কৃষিবিদদের হাতের স্পর্শে প্রাণ পায়। উজ্জীবিত হয় সংশ্লিষ্ট সবাই। এভাবেই ঘুরে দাঁড়ায় এ দেশের মেরুদন্ডখ্যাত কৃষকের অর্থনৈতিক অবকাঠামো।
কৃষিবিদরা নিজেদের মর্যাদা সমুন্নত রাখার জন্যই নিজ নিজ দায়িত্বে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছে। এ ধারা অব্যাহত থাকুক, এগিয়ে যাক আমাদের কৃষি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে বাংলাদেশ খাদ্যশস্য রফতানিকারক দেশে পরিণত হোক, কৃষিবিদ দিবসে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আর কৃষির দৃশ্যমান ধারাবাহিক উন্নয়নে কৃষিবিদরা জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় থাকুক।
লেখক- উপ পরিচালক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ই-মেইলঃ mbashirpro1986@gmail.com




