পৃথিবীর অন্যতম সুখী দেশ সুইজারল্যান্ড। ৯২ হাজার ডলার পার ক্যাপিটা আয়ের দেশটিকে এবার বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আমরা জানি, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সে দেশের অবস্থার মানদন্ড। যে দেশ যত বেশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীল, সে দেশ তত বেশি উন্নত। বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে বহু প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন দেশকে উন্নত করার লক্ষ্যে। শেষমেশ তিনি সুইস উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনৈতিক বিনিয়োগের জন্য।
দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি দিবো। তারা (উদ্যোক্তারা) বাংলাদেশে একটি মিনি সুইজারল্যান্ড তৈরি করতে পারে।’
সবচেয়ে খুশির বিষয় হলো সুইস রাষ্ট্রদূত আগ্রহ জানিয়েছে এ ব্যাপারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের সঙ্গে সুইস রাষ্ট্রদূতের এক সাথে কাজ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপও নেওয়া শুরু হয়েছে। প্রায় ৪০টি সুইস কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের অপারেশন পরিচালনা করছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সুইস বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের যেসব বাধার সম্মুখীন হতে হয় তা চিহ্নিত ও নিরসন এবং উভয় দেশের মাঝে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি আন্তঃসংস্থা কমিটি গঠন করে।
কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। তৎকালীন বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দিনের নেতৃত্বে সেদিন বৈঠকে বাধা কাটিয়ে বাণিজ্য সম্প্রসারণের দিকে জোর দেওয়া হয়।
সুইজারল্যান্ডও বাংলাদেশের মাঝে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠায় গত একদশকে বাণিজ্য বেড়েছে তিন গুণ। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক আকার ১ বিলিয়ন সুইসফ্র্যাংকের সমপ্রায়। এর মাঝে ১২৬ মিলিয়ন সুইস ফ্র্যাংকের পণ্য রপ্তানি করছে সুইজারল্যান্ড আর বাংলাদেশ রপ্তানি করছে ৯২৪ মিলিয়ন সুইস ফ্র্যাংকের পণ্য।
এভাবে দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমশ বেড়েই চলছে। এক সমীক্ষায় জানা যায়, ২০১০ সাল থেকে কোভিডের আগ পর্যন্ত বাণিজ্যিক আকার ৮৫০মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি দাড়িয়েছে। রাসায়নিক, টেক্সটাইল মেশিন এবং ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য রপ্তানির দিক দিয়ে সুইজারল্যান্ড বিশ্বে এগিয়ে আছে। ঠিক তেমনি বাংলাদেশও রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানিতে এগিয়ে আছে। সুবিধাস্বরূপ তারা তাদের পণ্য রপ্তানি করে বাণিজ্যিক আকার বৃদ্ধি করছে।
এ দিকে বাংলাদেশ সরকারও ব্যক্তিগত উদ্যোগে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত ৯৮ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠে। সেখানে সুইস উদ্যোক্তারা তাদের নিজস্ব প্ল্যান্ট স্থাপন করে কাজ করছে।
জাপানের ভারী শিল্পনির্মাতাদের পাশাপাশি কিছু দামী গাড়িও সবচেয়ে দামী গরুর মাংস কোবেবিফ প্রসেসিং এর প্ল্যান্ট স্থাপনের আগ্রহও দেখিয়েছে তারা। এ প্রযুক্তিগুলো পুরোপুরি কাজ শুরু করলে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে নতুন রূপ প্রকাশ করবে বাংলাদেশ।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নতদেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়ন শীলদেশে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের গ্রামীন জনগণের উন্নয়নই তার সরকারের মূল লক্ষ্য। তবে উন্নয়নের মেরুদন্ড মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সরকার চরম দারিদ্র্যের হার শূন্য করতেনা পারলে অন্তত ১ শতাংশে নামিয়ে আনতে অনেক কর্মসূচি নিচ্ছে।’
তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুইজারল্যান্ড সফরের স্মৃতি চারণ করে বলেন, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের' বাংলাদেশকে প্রাচ্যের ‘সুইজারল্যান্ড' গড়ে তোলার স্বপ্ন ছিল।”
বাবার শিখিয়ে দেওয়া পথেই হাঁটছেন মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা। বাবার স্বপ্ন পূরণ করে দেশকে দারিদ্র্য মুক্ত করতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বের অন্যতম সুখী দেশের সহযোগীতায় অনেকটা সফলও হয়েছেন।
১৯৭২ সালের ১লা মার্চ বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশের মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। ২০১৩ সাল থেকে টাটা পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়মিত রাজনৈতিক পরামর্শও বিনময় করেন।
“মিনি সুইজারল্যান্ড” গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ সরকার সুইজারল্যান্ডের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করে তুলেছেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক যেমন উন্নত হয়েছে ঠিক তেমনই উভয় দেশ উপকৃতও হচ্ছে। তুলনামূলক ভাবে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হচ্ছে। কেননা, দরিদ্র দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পিছনে বাণিজ্যিক উন্নতির সিংহভাগ অবদান সুইজারল্যান্ড-বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক।
সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করলে সুইজারল্যান্ডের স্বাদ পাবে বাংলাদেশও। আশা রাখছি খুব দ্রুতই আমরা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্থিতিশীল একটি রাষ্ট্র উপহার পাবো। কূটনৈতিক জগতে বিচক্ষণতার সাথে পদচারণ করা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এক মহান উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি আমাদের কে সকল ক্ষেত্রে আশার আলো দেখিয়েছেন। দারিদ্র্যতা থেকে বের হয়ে কীভাবে সুখ স্বচ্ছন্দে বসবাসের স্বপ্ন দেখা যায়; তিনি আমাদের তা শিখিয়েছেন। সাহস দেখিয়েছেন যেকোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে। মিনি সুইজারল্যান্ড গড়ে তোলার ধারণাটাও আশানুরূপ ফল রাখবে বলে জনগণের আশা রয়েছে।
প্রতিটি মানুষেরই স্বপ্ন থাকে, সুখী জীবন যাপনের। আরাম আয়েশ করে স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করা বাংলাদেশের মানুষের জন্য প্রায় সোনার হরিনই ছিলো বটে। তবে শেখ সিনার “মিনি সুইজারল্যান্ড” তৈরির উদ্যোগটি তাদের সে স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছে। এক্ষেত্রে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজ করা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ও আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। তাই “মিনি সুইজারল্যান্ড” এর অপেক্ষায় আধীর আগ্রহে রয়েছে গোটা জাতি।
বাণিজ্যিক জগতে মাইলফলক সৃষ্টি করতে যাওয়া সুইজারল্যান্ড-বাংলাদেশের উদ্যোগ “মিনি সুইজারল্যান্ড” অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি বদলে দিবে গোটা বাংলাদেশের চিত্র। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের জনগণও ভোগ করবে সকল সুযোগ সুবিধা। ব্যবহার করবে অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবেনা বাংলাদেশকে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়




