সালতামামি-২০২৩

নানামুখী চাপ সামলে ফের সরকার গঠনের পথে আ.লীগ

সজিব খান

বৃহস্পতিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩ , ০৮:৩৭ পিএম


আওয়ামী লীগ

চলতি বছরের শুরু থেকেই নানামুখী চাপে ছিল আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এ বছর সবচেয়ে বেশি চাপ সামলাতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলটিকে। বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর আন্দোলন ও পশ্চিমা দেশগুলোর অব্যাহত চাপ সামলাতেই বছর পার হয়ে গেছে দলটির। এ ছাড়া নির্বাচনী বছরে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অন্তঃকোন্দল মিটিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নানান কৌশলে সব চাপ সামলে টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের পথে এগোচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীনতম এ রাজনৈতিক দলটি।

বিজ্ঞাপন

দলের অন্তঃকোন্দল মেটানো
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। লম্বা সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে নানান সময়ে বিভিন্ন দল থেকে অনেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছেন। তাদের কেউ কেউ আবার দলীয় পদ-পদবিও বাগিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতি করেও অনেকে যথাযথ মূল্যায়ন পাননি। এসব কারণসহ নানান কারণে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল বেড়েছে। বিশেষ করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল ব্যাপক হারে বেড়েছে। যে কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দলটির অনেক নেতাকর্মী বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে ভোটে অংশ নেন। এর ফলে অনেককে বহিষ্কারও করা হয়।

নির্বাচনের বছরে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যকার অন্তঃকোন্দল মিটিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা ছিল আওয়ামী লীগের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বছরের শুরু থেকেই দলটি অনেকটা কৌশলী হয়ে পা ফেলছে। বছরের শুরুর দিকেই আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়। এরপর ছাত্রলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও যুব মহিলা লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। পাশাপাশি সারাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি দেওয়া হয়েছে।এসব কমিটিতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগী ও পরিক্ষিতদের রাখার চেষ্টা করেছে কেন্দ্র।এ ছাড়াও বিভিন্নভাবে দিকনির্দেশনা দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অন্তঃকোন্দল মেটানোর চেষ্টা করেছেন।

সবশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০০ আসনের বিপরীতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন ৩ হাজার ৩৬২ জন। এসব প্রার্থীকে গণভবনে ডেকে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন শেখ হাসিনা। এর আগেও ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে মনোয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছিলেন দলীয় প্রধান। কিন্তু সেবার দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু এবার মনোয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে তার মতবিনিময় সভায় ছিল চমক। সভায় কেউ যেন বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে না পারেন, সেজন্য প্রত্যেক আসনে একাধিক ডামি প্রার্থী রাখতে বলেন দলীয় প্রধান। এর ফলে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে দাঁড়ান কয়েকশ’ আওয়ামী লীগ নেতা। এভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচনের পাশাপাশি দলের মধ্যে অন্তঃকোন্দালও প্রশমিত করার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ।

বিজ্ঞাপন

বিরোধীদের আন্দোলন মোকাবিলা
টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগকে এবার কিছুতেই ছাড় দিতে রাজি না রাজপথের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি।২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলা দলটি এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া কোনোভাবেই নির্বাচনে যাবে না। অন্যদিকে সংবিধান অনুযায়ী, দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে অনড় ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। বছরের শুরু থেকেই সরকারের পতন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে সক্রিয় বিএনপি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয় এলডিপি, গণফোরাম, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদসহ আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক দল। প্রথম দিকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ছোটো ছোটো সভা-সমাবেশ ও কর্মসূচি পালন করলেও বছরের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে বিরোধীদের আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। এক পর্যায়ে গত ১২ জুলাই নয়াপল্টনে মহাসমাবেশ করে সব সমমনা দল ও জোটকে নিয়ে সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবির যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। অন্যদিকে একইদিনে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটে সমাবেশ করে সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে বলে একদফা ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। এর ফলে দাবি আদায়ে বিক্ষোভ সমাবেশ, পদযাত্রা, অবস্থান কর্মসূচি, গণমিছিল ও রোডমার্চ কর্মসূচি দিয়ে রাজপথ সরগরম করে তোলে বিএনপি ও তার মিত্ররা। তবে বিরোধীদের মোকাবিলায় রাজপথে ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। বিএনপি বিক্ষোভ সমাবেশ করলে আওয়ামী লীগ করতো শান্তি সমাবেশ। বিএনপি গণমিছিল দিলে রাজপথে সতর্ক পাহারায় থাকতো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এভাবেই বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন মোকাবিলায় রাজপথে সরব ছিল ক্ষমতাসীন দলটি। এর মধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে দুটি দলকে সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হলেও তা হয়নি। বিএনপির দাবি ছিল, সরকার পদত্যাগ করলে তারা সংলাপে বসবে।অন্যদিকে শর্তযুক্ত সংলাপে রাজি হয়নি আওয়ামী লীগ। ফলে দুটি দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি অব্যাহত ছিল।

দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দলের পাল্টপাল্টি নানান কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল। তবে গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দলটির নেতাকর্মীরা একই দিনে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটে শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ করে আওয়ামী লীগ।সেদিন দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশ লাঠি নিয়ে সমাবেশে এলেও দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে সমাবেশ শেষে শান্তিপূর্ণভাবে তারা বাড়ি ফিরে যান। অন্যদিকে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে বিএনপির নেতাকর্মীদের। সংঘর্ষ চলাকালে প্রধান বিচারপতি বাড়িতে হামলা, একাধিক যানবাহন ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষে পুলিশ কনস্টেবলসহ দুজন নিহত এবং ৭০ জনের মতো আহত হন। এরপর থেকে টানা বেশ কয়েক দিন হরতাল ও অবরোধের পর বর্তমানে অসহযোগ আন্দোলন করছে বিএনপি ও তার মিত্ররা। অন্যদিকে বিএনপির আন্দোলনের মধ্যেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তবে সেই তফসিল প্রত্যাখ্যান করে দফায় দফায় হরতাল অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। তাদের এসব কর্মসূচি চলাকালে ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে ২৮৫টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আগুনে ১৫টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে তফসিলের পর থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি, দলীয় মনোয়ন সম্পন্ন ও প্রতীক বরাদ্দ শেষে এখন প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

নির্বাচনের আগে ব্যাপক মামলা-গ্রেপ্তার
গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশ চলাকালে সহিংসতার ঘটনায় ৩৬টি মামলায় নাম উল্লেখ করে ১ হাজার ৫৪৪ জনকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহসহ বেশ কজন সিনিয়র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বেশ কয়েকবার জামিনের আবেদন করেও তারা মুক্ত হতে পারেননি।
বিএনপির অভিযোগ, ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ এবং এর পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘিরে দলটির ১৬ হাজার ৬৭৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোট মামলা হয়েছে ৩৪৬টি। এমনকি মৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও নাশকতার মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে। সাড়ে তিন বছর আগে মারা যাওয়া বিএনপির সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক প্রয়াত এডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বিরুদ্ধে রামপুরা থানায় নাশকতার মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই মামলায় ১ বছর আগে মারা যাওয়া মো. নাসির রহমান নামের আরও এক ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক পুরোনো মামলা সচল করে দলটির নেতাকর্মীদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাজার চাপে ফেলা হয়েছে। গত ১৫ বছরে নাশকতার অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া শতাধিক মামলায় দেড় হাজারেরও বেশি বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন আদালত। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর অভিযোগ, মূলত নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে ও বিএনপি নেতাকর্মীদের ভয় দেখাতে সরকার পরিকল্পিতভাবে নাশকতা ঘটিয়ে বিএনপির ওপর দায় চাপাচ্ছে। একই সঙ্গে পুরোনো মামলা সচল করে নেতাকর্মীদের কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। রিজভীর দাবি, চলতি ডিসেম্বরসহ গত ৫ মাসে সারা দেশে বিএনপির ২৬ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে। কারাগারে মারা গেছেন দলটির ১৩ জন নেতাকর্মী।

পশ্চিমাদের চাপ সামলানো
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বছরের শুরু থেকেই ঢাকায় বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। একদিকে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর আন্দোলন অন্যদিকে নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের নানান বিবৃতি, বক্তব্য ও পদক্ষেপে অনেকটা চাপে পড়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
নির্বাচন সামনে রেখে বিদায়ী বছরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের রাজনীতিবিদ ও কূটনৈতিকরা ঢাকা সফর করেছেন। তারা আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছেন। তারা আগামীতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চেয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চেয়ে একাধিকবার বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরও বেশকিছু দেশ ও বিদেশি সংস্থা।

এর মধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বেশি সরব ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি একাধিকবার বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন ঘিরে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের তৎপরতা ছিল ব্যাপক। তিনি দফায় দফায় সরকারি দল, বিরোধীদল ও নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এর মধ্যে গত ২২ সেপ্টেম্বর ভিসানীতি আরোপ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার এক বিবৃতিতে জানান, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু করেছে। এসব ব্যক্তিদের মধ্যে বর্তমান এবং প্রাক্তন বাংলাদেশি কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী, বিচার বিভাগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এমন ঘোষণার পর বিএনপির আন্দোলনের পালে যেন হাওয়া লাগে। দলটির নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে নানান হুমকি ও আল্টিমেটাম দেন। তবে সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে অনড় ছিল আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যেই দাবি বিএনপি তুলছে, সেটি নিয়ে বিদেশিরা কিছু বলেনি। বরং সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে এবং পশ্চিমা চাপ সামাল দিতে ভারত, চীন ও রাশিয়াকে পাশে পেয়েছে আওয়ামী লীগ। গত ৯ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, তার দেশ চায় সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করছে বলে একাধিকবার বিবৃতি দেয় রাশিয়া। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারতও বাংলাদেশে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন চেয়েছে। একইসঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে উল্লেখ করেছে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি। ফলে পশ্চিমাদের মাধ্যমেও বিএনপির দাবি পূরণ হয়নি। শেষে গত ১৫ নভেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন দুপুরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস দুটি দলকে সংলাপে বসার চিঠি দিলেও তাতে সাড়া দেয়নি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।

সরকার পরিচালনায় সংকট মোকাবিলা
২০২৩ সালটা ছিল সরকার পরিচালনার জন্য আওয়ামী লীগের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারবিরোধী আন্দোলন ও নির্বাচন ঘিরে পশ্চিমাদের চাপের মধ্যেই নানান সংকট সামাল দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারকে। এ বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, সেইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রতি মাসে কমতে থাকে আশঙ্কাজনকভাবে। এ ছাড়া রপ্তানি আয় কমে যাওয়া, প্রবাসী আয়ে ধীরগতি ও ডলারসংকটের কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের চাপ ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকটা হিমশিম খেতে হয়েছে সরকারকে।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ হার বাড়ায়। যে কারণে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে এসেছে। সরকারের নানান উদ্যোগের ফলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও কমে আসবে বলে মনে করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। 
এ ছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে পাঁচ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সে উল্লম্ফন লক্ষ্য করা যায়। পাশপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে পাওয়া ঋণের অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে যোগ হওয়ায় রিজার্ভ বেড়ে ২০ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই নানান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়েছে সরকার। বিদায়ী বছরে মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, মাতারবাড়ী সমুদ্র বন্দর চ্যানেল, পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে রেল চালু করেছে সরকার; যা দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও নাগরিক জীবনে অনেকটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।

ফের সরকার গঠনের পথে আওয়ামী লীগ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। এরপর সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। বিএনপির দাবি দলীয় সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। এর ফলে তারা ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে। পরবর্তীতে নানান নাটকীয়তা ও সংলাপের পর অবশেষে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। শুধু বিএনপি নয়, ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ওই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। তবে নির্বাচনে মাত্র সাতটি আসন পায় বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট । এরপর তারা কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচনের ফল প্রত্যখ্যান করলেও শেষ পর্যন্ত সংসদে যায়। আর টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। তবে এবার আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাচ্ছে না রাজপথের প্রধান বিরোধীদল বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল। তাই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় যেসব দল আসেনি, তাদের ছাড়াই আগামী ৭ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে অংশ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, সংসদের প্রধান বিরোধীদল জাতীয় পার্টি ও তৃণমূল বিএনপিসহ ২৭টি দল। যেহেতু দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি নির্বাচনে আসেনি এবং নির্বাচনে যেসব দল অংশ নিচ্ছে তাদের জনপ্রিয়তা আওয়ামী লীগের তুলনায় অনেকটা তলানিতে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মনে করা হচ্ছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ।

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission