ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

চলছে সরকার গঠনের প্রস্তুতি, ভারত ও বিশ্বের প্রতি বিএনপির বার্তা

এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে থাকবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দিনটি। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শৃঙ্খলা যখন গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন নির্ণায়ক সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পরবর্তী সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এই ম্যান্ডেট কেবল অভ্যন্তরীণ দায়িত্বই বহন করে না, বরং ভারত এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। আর তা হলো— বাংলাদেশ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা এবং ভাগাভাগি সমৃদ্ধির উপর ভিত্তি করে গঠনমূলক অংশীদারিত্ব চায়।

বাংলাদেশ প্রথম: দায়িত্বশীল সার্বভৌমত্বের নীতি

বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হলো— ‘বাংলাদেশ প্রথম’। এই নীতি বিশ্বের সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং নাগরিকদের কল্যাণ রক্ষার প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে।

বাংলাদেশের সীমানার বাইরেও অংশীদার এবং বন্ধু আছে, পৃষ্ঠপোষক নয়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার উপর জোর দেবে। বাংলাদেশ একটি আত্মবিশ্বাসী কিন্তু বাস্তবসম্মত বৈশ্বিক ভূমিকা পালন করবে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি সংঘাতের চেষ্টা করে না। বরং এর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক বৈধতার অবস্থান থেকে জড়িত হওয়া নিশ্চিত করা।

ভারতের সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ

ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির একটি অপরিহার্য অংশীদার। ভূগোল, ইতিহাস এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক বন্ধন নিশ্চিত করে যে ঢাকা এবং নয়াদিল্লির মধ্যে সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ গঠন অব্যাহত রাখবে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার সমতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে একটি সম্পর্ক কল্পনা করে। আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, তিস্তা ও অন্যান্য নদীর সুষ্ঠু পানি বণ্টন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগসহ দীর্ঘস্থায়ী বিষয়গুলোতে গঠনমূলক সংলাপ আস্থা তৈরির কেন্দ্রবিন্দু হবে।

বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি পারস্পারিক শ্রদ্ধা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পরিচালিত করবে। দুই দেশের মধ্যে একটি পরিপক্ক অংশীদারিত্ব বাণিজ্য, সংযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ উন্মোচন করতে পারে, যা উভয় দেশের নাগরিকদের উপকার করবে।

আরও পড়ুন

বিশ্বব্যাপী দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী করায় জোর দেবে বিএনপি

বিএনপির পররাষ্ট্র নীতি অঞ্চল জুড়ে দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার উপর জোর দেবে। বিএনপির নেতৃত্বে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক গভীর করবে, আসিয়ান কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে এবং আঞ্চলিক সংলাপের জন্য সার্ককে একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য কাজ করবে।

ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রেক্ষাপটে সমুদ্র নিরাপত্তা, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা এবং নৌ চলাচলের স্বাধীনতা প্রচারে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চায় বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকার করে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, টেকসই মৎস্য এবং অর্থনৈতিক সংযোগসহ ভাগ করা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

আগামীর বাংলাদেশ পথপ্রদর্শক নীতির বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততা বজায় রাখবে। একইসঙ্গে জাতীয় স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে এমন জোট এড়িয়ে প্রধান বিশ্ব শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে।

অর্থনৈতিক কূটনীতি: অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পরিচালনা

অর্থনৈতিক কূটনীতি আগামীর বাংলাদেশের বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হবে। উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে একীভূতকরণ জোরদার করা প্রয়োজন।

বিএনপি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি, সম্প্রসারিত বাজার অ্যাক্সেস এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেবে, যা প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্পে মূল্য সংযোজনকে উৎসাহিত করে। দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সীমিত বাজারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস এবং কৃষি ও উৎপাদনের জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার উপরও প্রচেষ্টা জোরদার করা হবে।

শ্রম ও অভিবাসন কূটনীতিতে নতুন করে মনোযোগ দেওয়া হবে, যাতে বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীরা মর্যাদা ও সুরক্ষার বজায় রেখে বিশ্বব্যাপী সুযোগগুলো গ্রহণ করতে পারে। ভারত এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারদের জন্য এই উদ্যোগগুলো যৌথ উদ্যোগ, আন্তঃসীমান্ত উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল সহযোগিতার সুযোগ প্রদান করে।

আরও পড়ুন

মুসলিম বিশ্ব এবং উদীয়মান অংশীদারদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পৃক্ততা

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিম এশিয়া এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছে। নতুন সরকার উপসাগরীয় বিনিয়োগ ক্ষমতাকে বাংলাদেশের মানবসম্পদ এবং উৎপাদনশীল খাতের সঙ্গে সংযুক্ত করে উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিল (GCC) দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার ইচ্ছা পোষণ করে।

এই অংশীদারিত্বগুলো শ্রম অভিবাসনের বাইরেও প্রসারিত হবে, যেন খাদ্য নিরাপত্তা উদ্যোগ, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায় এতে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা এবং ওশেনিয়ার অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে সচেষ্ট থাকবে, যা একটি বৈচিত্র্যময় কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করবে।

যৌথ পদক্ষেপের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা

বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম রোহিঙ্গা সংকট। লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ আমাদের সীমান্তের মধ্যে বসবাস করে চলেছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায় এবং সম্পদের উপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে।

রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকারসহ মিয়ানমারে নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে প্রত্যাবাসনকে বিএনপি সর্বোচ্চ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে টেকসই সমাধান অর্জনের জন্য প্রতিবেশী দেশ, আঞ্চলিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ।

সাংস্কৃতিক কূটনীতি

আধুনিক কূটনীতি ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রীয় কৌশলের বাইরেও বিস্তৃত। বাংলাদেশ শিক্ষা বিনিময়, সাংস্কৃতিক সম্পৃক্ততা, ক্রীড়া কূটনীতি এবং যুব সহযোগিতার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কূটনীতির উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে চায়। ভারত এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বোঝাপড়া বৃদ্ধি করতে পারে এবং অবিশ্বাস কমাতে পারে, টেকসই অংশীদারিত্বের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের গতিশীল তরুণ প্রজন্ম সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির মধ্যে সেতুবন্ধনের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্বব্যাপী সংলাপে তাদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা হলে দেশের আন্তর্জাতিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে এবং তা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে উৎসাহিত করবে।

একটি দায়িত্বশীল বৈশ্বিক ভূমিকা

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনি ম্যান্ডেট দেশে এবং বিদেশে পুনর্নবীকরণের জন্য প্রচেষ্টারত একটি জাতির আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে। ভারত এবং বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের বার্তা হলো নির্ভরতাহীন অংশীদারিত্ব, আপসহীন সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে অগ্রগতি।

ক্রমবর্ধমানভাবে বিভক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ একটি গঠনমূলক এবং দায়িত্বশীল কর্তা হিসেবে কাজ করার লক্ষ্য রাখে; আঞ্চলিক শান্তি জোরদার করা, অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিনিময়কে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায় বাংলাদেশ।

সামনের পথচলার জন্য ধৈর্য,​সংলাপ এবং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন হবে। তবুও এই দিকটি স্পষ্ট: একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ তার জনগণের স্বার্থ এবং মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সকল জাতির সাথে যোগাযোগ করতে প্রস্তুত।

লেখক: এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর আইসিটি বিষয়ক সম্পাদক।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের সেরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় শীর্ষে ক্যালিফোর্নিয়ার দুই প্রতিষ্ঠান
নবীনদের পদচারণায় মুখর বদরুন্নেসা কলেজ
এক বাড়িতে বিএনপি করলে সবার বিএনপি হতে হবে: গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী
সুন্দরগঞ্জে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ