ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা: ইনজেকশনে সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব

আরটিভি নিউজ

রোববার, ৩১ মে ২০২৬ , ০৭:৫৯ পিএম


ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা: ইনজেকশনে সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব
প্রতীকী ছবি

ত্রিমুখী ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ধরনের একটি ক্যানসারবিরোধী ইনজেকশন রোগীদের শরীরের টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে। চিকিৎসকরা এই ফলাফলকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে অভিহিত করেছেন। এটি ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ১১টি দেশে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক ট্রায়ালে (ক্লিনিকাল ট্রায়াল) এমন রোগীদের এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, যাদের ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে বা পুনরায় ফিরে এসেছে এবং প্রচলিত অন্যান্য চিকিৎসায় কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।

‘অ্যামিভ্যান্টাম্যাব’ (Amivantamab) নামের এই ইনজেকশন এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগীর টিউমার ছোট করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। এর মধ্যে ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা দেখতে পান, তাদের টিউমার সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে গেছে।

লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যান্সার রিসার্চের (আইসিআর) জৈবিক ক্যানসার চিকিৎসাবিষয়ক অধ্যাপক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, ‘যেসব রোগীর ক্যানসার কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি উভয় চিকিৎসারই প্রতিরোধী (রেজিস্ট্যান্ট) হয়ে উঠেছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি নজিরবিহীন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া।’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের রোগীদের জন্য চিকিৎসার বিকল্প খুবই সীমিত। তাই এমন সুফল সত্যিই অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।’

একইসঙ্গে রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের কনসালট্যান্ট অনকোলজিস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা হ্যারিংটন আরও বলেন, ‘এই চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।’

শিকাগোতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যান্সার সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’র (অ্যাসকো) বার্ষিক সভায় রবিবার (৩১ মে) এই ফলাফল উপস্থাপন করা হবে।

আরও পড়ুন

মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আশাব্যঞ্জক ফল

ট্রায়ালে বিশ্বের ষষ্ঠ সর্বাধিক প্রচলিত ক্যানসার—মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীকে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪৩ জনের টিউমার ছোট হয়ে যায় বা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এর মধ্যে ২৮ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয় এবং ১৫ জনের টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়।

গবেষকরা জানান, ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ইনজেকশন একই ধরনের ইতিবাচক ফল দেখিয়েছে।

জনসন অ্যান্ড জনসনের উদ্ভাবিত অ্যামিভ্যান্টাম্যাব বর্তমানে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফুসফুসের ক্যানসারের পাশাপাশি মলাশয় (কোলোরেক্টাল), মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ইনজেকশনের কর্মপ্রক্রিয়া

এই ‘স্মার্ট’ ইনজেকশন তিনটি ভিন্ন উপায়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজ করে।

প্রথমত, এটি ইজিএফআর (এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিসেপ্টর) নামের এমন একটি প্রোটিনকে বাধা দেয়, যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।

দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি (MET) নামের একটি পথও বন্ধ করে দেয়, যেটি ব্যবহার করে ক্যানসারের কোষগুলো প্রচলিত চিকিৎসাকে ফাঁকি দিতে পারে।

তৃতীয়ত, এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে।

অন্যান্য অনেক ক্যানসার চিকিৎসার মতো অ্যামিভ্যান্টাম্যাব শিরায় স্যালাইনের মাধ্যমে না দিয়ে ত্বকের নিচে ছোট একটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসা দ্রুত, সহজ এবং বহির্বিভাগে পরিচালনা করাও সুবিধাজনক।

প্রতি তিন সপ্তাহে একবার দেওয়া এই চিকিৎসার বেশিরভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই ছিল মৃদু বা মাঝারি মাত্রার। ১০ জনের মধ্যে একজনেরও কম রোগীকে এই চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।

স্বাভাবিক জীবনে ফেরা এক রোগীর গল্প

এই চিকিৎসার সুফল পাওয়া প্রথমদিকের রোগীদের একজন হলেন ৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ। ২০২৪ সালের মে মাসে তার জিহ্বায় ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তিনি রয়্যাল মার্সডেনে ‘অরিগ্যামি-৪’ (OrigAMI-4) নামের ওই ট্রায়ালে যোগ দেন।

তিনি বলেন, ‘শুরুতে আমাকে কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেগুলো সফল হয়নি। এরপর আমাকে অরিগ্যামি-৪ ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এখন আমি চিকিৎসার সপ্তদশ চক্রে আছি এবং এ পর্যন্ত অগ্রগতিতে আমি খুবই সন্তুষ্ট।’

ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের এই বাসিন্দার ভাষ্য, ‘এখন আমি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি। ট্রায়াল শুরু করার আগে ফোলা ও ব্যথার কারণে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না, খেতেও কষ্ট হতো।

‘চিকিৎসা শুরু করার পর ফোলাভাব অনেক কমে গেছে এবং ব্যথাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কেমোথেরাপির সময় জীবনের ওপর যে ধরনের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছিল, এখন আর তা হচ্ছে না।’

নিজের পুরোনো দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, অসুস্থতার সবচেয়ে কঠিন সময়ে তাকে স্যুপ, রাইস পুডিং, ক্যানজাত পাস্তা ও অমলেটের মতো নরম খাবার খেতে হতো। এর সঙ্গে দিনে তিনবার চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী পুষ্টিকর দুধের পানীয়ও খেতে হতো। এতে তার ওজনও বেশ কমে গিয়েছিল।

‘তবে, চিকিৎসার মাত্র দুই চক্রের পর থেকেই আমার খাদ্যাভ্যাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে এবং ছয় মাসের মধ্যে আমি সব ধরনের খাবার খেতে পারছিলাম। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিল অনেক দিন পর প্রথম বড় স্টেক খাওয়া। আমার কথাবার্তাও এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক এবং কর্মক্ষেত্রে হেডসেট ব্যবহার করে নিয়মিত কথা বলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না,’ বলেন তিনি।

কঠিন ধরনের ক্যানসারেও ইতিবাচক অগ্রগতি

গবেষকরা জানান, এই ট্রায়ালে মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল, তবে তার মধ্যে হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) পজিটিভ ওরোফ্যারিন্জিয়াল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার রোগীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।

তারা বলেন, এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ ধরনের ক্যানসার সাধারণত চিকিৎসা করা আরও কঠিন। তাই এই গ্রুপের রোগীদের ক্ষেত্রে এমন অগ্রগতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বহন করে।

প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেওয়ার পর এই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা যেখানে খুবই কম থাকে, সেখানে অ্যামিভান্টাম্যাব নেওয়া রোগীরা চিকিৎসা শুরুর পর গড়ে সাড়ে ১২ মাস বেঁচে ছিলেন।

আইসিআরের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ক্রিস্টিয়ান হেলিন বলেন, ‘এই গবেষণাটি দেখিয়েছে যে কীভাবে কঠোর বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব, যা সীমিত চিকিৎসার সুযোগ থাকা রোগীদের ক্ষেত্রেও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন এমন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এই মাত্রার প্রতিক্রিয়া এবং বেঁচে থাকার আশাব্যঞ্জক হার অর্জন করা নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission