একসময় পরিবারে সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটা বা মেয়েটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা হতো- একদিন সে দেশের বড় চিকিৎসক, গবেষক কিংবা স্বনামধন্য অন্য কোনো পেশায় নিযুক্ত হবে। কিন্তু এখন সেই স্বপ্নের শেষ গন্তব্য দেশ ছেড়ে হয়ে উঠছে কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের কোনো শহর। বিমানবন্দরের বিদায়ের মুহূর্তে চোখে পানি থাকলেও, অনেকের মনেই একটা কথা ঘুরতে থাকে হয়তো আর ফেরা হবে না।
বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা গত কয়েক বছরে বেড়েছে ভয়ংকরভাবে । ইউনেসকোর তথ্য বলছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৭০ থেকে ৯০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ বাংলাদেশিকে স্টাডি পারমিট দিয়েছে। এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ১৭ হাজারেরও বেশি পৌঁছেছে। যা তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬% বেশি এবং ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানও এখন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় গন্তব্য।
কারণও আছে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একের পর এক স্কলারশিপ দিচ্ছে, টিউশন ফি কমাচ্ছে, পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের পোস্ট স্টাডি ওয়ার্ক পারমিট কিংবা কানাডার স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তরুণদের কাছে এক ধরনের নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। যারা যাচ্ছে, তাদের বড় একটা অংশ আর ফিরছে না। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের প্রতি ব্যাচের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাদের খুব কম সংখ্যকই দেশে ফিরে আসে বলে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও বিদেশে থেকে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কেউ আবার উচ্চতর ডিগ্রি নিতে গিয়ে আর ফেরেন না, কেউ পিএইচডির পর বিদেশেই স্থায়ী হয়ে যান।
এর পেছনে শুধু টাকার বিষয় নেই। আছে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপদ জীবনের আকাঙ্ক্ষা। দেশে হাজার হাজার শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেও চাকরি পাচ্ছে না। আর পেলেও যোগ্যতা অনুযায়ী মিলছে না পারিশ্রমিক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট, গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও প্রতিযোগিতার চাপ অনেককে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। ফলে বিদেশের পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস, নির্ভরযোগ্য জীবনব্যবস্থা ও সম্মানজনক কাজের সুযোগ তাদের কাছে স্বপ্নের মতো।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকেই বলেন ‘ব্রেইন ড্রেইন। অর্থাৎ, একটি দেশের সবচেয়ে মেধাবী মানুষগুলো ধীরে ধীরে অন্য দেশের হয়ে যাওয়া। তাদের মতে এই ‘ব্রেইন ড্রেইন’ শুধু কয়েকজন মেধাবীর দেশত্যাগ নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। কারণ একটি দেশ যখন নিজের সেরা মেধাগুলো ধরে রাখতে পারে না, তখন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যেও জন্ম নেয় এক ধরনের অনাস্থা যেখানে মনে হয়, ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে হলে দেশ ছাড়তেই হবে।
আরটিভি/এআর



