প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে হঠাৎ ভেসে ওঠে একটি সাবমেরিন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আকাশ চিরে ছুটে যায় বিশাল এক ক্ষেপণাস্ত্র। এতে ছিল না কোনো বিস্ফোরক। কিন্তু বিস্ফোরণের শব্দ ছাড়াই এই একটি উৎক্ষেপণই দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে। এরপরই উঠেছে প্রশ্ন, চীন কি শুধুই একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করল, নাকি পুরো বিশ্বের উদ্দেশে পাঠাল শক্তির বার্তা?
গেলো সোমবার পারমাণবিক শক্তিচালিত একটি সাবমেরিন থেকে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম উৎক্ষেপণ করে চীন। দেশটির দাবি, এটি ছিল বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ। কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে এই পরীক্ষা চালানো হয়নি এবং ক্ষেপণাস্ত্রটিতে ছিল না কোনো পারমাণবিক ওয়ারহেডও। সংবাদমাধ্যম ইনডিপেনডেন্ট এর প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে এই তথ্য।
তবে উদ্বেগের কারণ অন্য জায়গায়। এটি ছিল প্রায় দুই বছর পর প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের প্রথম আইসিবিএম পরীক্ষা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রটি এমন ধরনের, যা চীনের উপকূল থেকে উৎক্ষেপণ করেও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া গত মঙ্গলবার ক্ষেপণাস্ত্রটির একটি ছবি প্রকাশ করেছে। তা দেখে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, এটি জেএল-৩ অথবা জেএল-২ শ্রেণির সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। এর মধ্যে জেএল-৩-এর পাল্লা ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। অর্থাৎ, পৃথিবীর বহু দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও এটি পৌঁছাতে পারে। চীনের রাষ্ট্র-সমর্থিত সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস ও জানিয়েছে এই তথ্য।
আর এখানেই শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক বিতর্ক। কারণ ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের সেই অঞ্চলে, যেটিকে ১৯৮৬ সালের রারোটোঙ্গা চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। চীন নিজেও পরে সেই চুক্তির সংশ্লিষ্ট প্রটোকলে সম্মতি দিয়েছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র, টমি পিগট জানায়, বিশ্ব যখন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তখন চীন হাঁটছে ঠিক উল্টো পথে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য, বেইজিংয়ের এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টাকে দুর্বল করছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজও এই পরীক্ষাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার অভিযোগ, এত বড় ধরনের সামরিক পরীক্ষা চালানোর আগে প্রতিবেশী দেশগুলোকে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জানানো হয়েছে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
নিউজিল্যান্ড একে বলেছে অনাকাঙ্ক্ষিত আর তাইওয়ানের দাবি, এটি ভয় দেখানোর কৌশল। এমনকি চীনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে পরিচিত সলোমন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী ম্যাথিউ ওয়ালে বলেছেন, বন্ধু যদি হয়, তাহলে ভয় দেখানোর প্রয়োজন নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরীক্ষার সময়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক তখনই অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করছিল। অনেকের ধারণা, সেই প্রেক্ষাপটেই চীন নিজের সামরিক সক্ষমতার একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে। অবশ্য বেইজিং অস্বীকার করেছে সব অভিযোগ। তাদের দাবি, এটি ছিল নিয়মিত সামরিক মহড়ার অংশ এবং পুরো প্রক্রিয়া নিরাপদ ও পেশাদারভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।
আরটিভি/এআর



