একটা ফুটবল দলের মস্তিষ্ক হিসেবে যদি কোন কিছুকে বলা হয় তবে সেটা অবশ্যই দলের মিডফিল্ড। দলের আক্রমণের উৎস যেমন এই মাঝ মাঠ, তেমনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ আটকানোর ধারাও শুরু হয় এখান থেকেই। সাধারণ দৃষ্টিতে অ্যাটাকাররা আক্রমণ করে আর ডিফেন্ডাররা আক্রমণ ঠেকায় এরকমটা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে খেলাটা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন মিডফিল্ডাররাই। সোজা কথায় মিডফিল্ডকে একটি ফুটবল দলের নিউক্লিয়াস বললেও ভুল বলা হবে না বৈকি।
মাঝমাঠকে যদি কোনো দলকে মস্তিষ্ক বলা হয় তো হৃদপিণ্ড বললে অবধারিতভাবে বলতে হবে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের কথা। কারণ সেন্ট্রাল মিডফিল্ডই দলের রক্ষণ ও আক্রমণভাগের সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করে। ফুটবল মাঠকে দাবার বোর্ড আর খেলোয়াড়দের ঘুঁটি হিসেবে ধরলে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা কারণ তারাই সৃষ্টিশীলতার সর্বোচ্চ ও উৎকর্ষ। মাঝ মাঠ যদি শক্তিশালী না হয় তাহলে দল নিশ্চিতভাবেই মাঝিবিহীন নৌকার মতোই পরিণত হবে।

লুকা মদ্রিচ আধুনিক ফুটবলের ইঞ্জিনখ্যাত সেই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নাম। ক্রোয়েশিয়ার এই ফুটবলারের উচ্চতা খুব বেশি না, মাত্র ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। অন্যান্য ইউরোপিয়ানদের বিবেচনায় এই ক্রোটকে খর্বকায় বললে খুব বেশি দ্বিমত করার সুযোগ নেই। কিন্তু কিংবদন্তি হওয়ার পথে মডরিচের সামনে উচ্চতা মোটেও প্রতিকূলতা হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। বরং শিল্পীর নিখুঁত তুলির আচঁড়ে শতগজি সবুজ ক্যানভাসকে শিল্পকর্ম বানাতে ছোটোখাড় গড়নের এই ক্রোয়েশিয়ানের জুড়ি নেই।
লুকা মদ্রিচের জীবনটাকে চাইলে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো ফুটবলার হওয়ার আগের জীবন। লুকার সেই জীবন ছিল সংগ্রামের। সেই জীবনে যুদ্ধের ভয়াবহতা আর মৃত্যুর চোখরাঙানিকে খুব কাছ থেকে পরখ করেন এ ক্রোয়েশিয়ান। আপাতত মডরিচের জীবনের এ অধ্যায়টা নিয়ে জানা যাক।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এক সময়কার প্রতাপশালী সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন শুরু হয়। সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি বিরোধিতার মুখে যুগোস্লাভিয়াও ততদিনে আলাদা হয়ে গেছে। বলকান অঞ্চলে যখন অস্থিরতা বিরাজমান, সেই সময়ে জাদার শহরে ১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর আলো দেখেন মদ্রিচ। ক্রোয়েশিয়া অবশ্য তখনও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিতি পায়নি। যুগোস্লাভিয়া এবং আরও নির্দিষ্ট করে বললে সার্বিয়ার অধীন থেকে মুক্ত হতে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এই দেশটির সময় লেগে যায় আরও বছর ছয়েক।

১৯৯১ সালে স্বাধীনতা পেলেও সেই বছরের শেষদিকে ক্রোয়েশিয়ার বলকান অঞ্চলে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ফলে সার্বিয়ান বিদ্রোহীদের বর্বরতার হাত থেকে তখনো নিস্তার মিলল না ক্রোয়েশিয়ানদের। বরং সদ্য স্বাধীন দেশটিতে চলছিল সার্বিয়ান বিদ্রোহী আর যুগোস্লাভিয়ার সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ। স্বাধীনতার স্বাদ বোঝার আগেই সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে প্রাণ গেল লুকা মডরিচের। না না, ইনি আজকের এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার নন বরং তার দাদা। দাদাকে আদর্শ মানা মদ্রিচের জীবনও যেন হুমকির মুখে না পড়ে সেজন্য তাকে নিয়ে ৪০ মিটারের দূরবর্তী শরণার্থী শিবিরে চলে আসেন তার বাবা-মা।
ছোট্ট লুকার বয়স তখন সবে ছয়। এই বয়সের যেকোনো শিশুরই তখন হেসেখেলে বেড়ানোর কথা। অথচ জীবন নিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্মম বাস্তবতার কষাঘাতে লুকা পরিণত হন উদ্বাস্তুতে। গৃহযুদ্ধের বর্বরতায় চারদিকে অস্ত্রের দামামা আর গোলাবারুদের দম আটকানো গন্ধের মাঝেও অবশ্য মদ্রিচের কাছে প্রাণোচ্ছলতার উপলক্ষ হয়ে এসেছিল ফুটবল। শরণার্থী শিবিরে পরিণত হওয়া কলোনাডো হোটেলের সামনে সামান্য জায়গা পেলেই তাতে বল নিয়ে রোগা শীর্ণকায় মদ্রিচ খেলে বেড়াতেন।
উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় মিললেও জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা তখনো মডরিচকে ঘিরে ছিল। স্বাধীনতার পরেও ক্রোয়েশিয়ার পথে পথে তখনো পোঁতা থাকতো প্রাণঘাতী মাইন। পাশাপাশি সার্বিয়ান বিমান হামলা আর ভেলিবিট পাহাড়ের অপরপাশ থেকে উড়ে আসা বোমার ভয় তো ছিলোই। শরণার্থী অন্য শিশুর মতো ছোট্ট লুকাকেও তাই সতর্ক থাকতে বলা হতো।
কিন্তু মৃত্যুভয়কে পাশ কাটিয়ে শরণার্থী শিবিরে ছোট্ট লুকার ফুটবল প্রতিভার অঙ্কুরোদগম শুরু হয়। বলতে গেলে জাদারের সেই রিফিউজি হোটেলেই ফুটবল নিয়ে হাতেখড়ি হয় তার। উদ্বাস্তু শিবিরের বিভিন্ন কমর্চারীদেরও চোখ এড়ায়নি লুকার ফুটবল প্রতিভা। মডরিচকে নিয়ে নির্মিত এক প্রামাণ্যচিত্রে সেই রিফিউজি হোটেলের এক কর্মচারী তো নিজ মুখেই জানান, বোমার আঘাতের চেয়ে লুকার বলের আঘাতেই আমাদের হোটেলের জানালা বেশি ভেঙেছিল।
শৈশবে চোখের সামনে দাদার মৃত্যুর পাশাপাশি মড্রিসি গ্রামে নিজেদের বাড়িটিও পুড়তে দেখেছিলেন শিশু লুকা। এরপর শরণার্থী শিবিরে ফুটবলের পাশাপাশি প্রাণের ভয়কে সঙ্গী করে চলা মডরিচ তাই অল্প বয়সেই নির্মম বাস্তবতার স্বাদ পান। শৈশবের সেই কঠিন সময়গুলোই তাকে মানসিকভাবে শক্ত হতে শিখিয়েছে। দম বন্ধ থাকার সেই দিনগুলোর কথা লুকা কখনোই ভোলেননি। কিন্তু তাই বলে সেগুলোর স্মৃতিচারণেও বড্ড আপত্তি তার। নিজের আত্মজীবনী মোয়া ইগ্রোতে মদ্রিচ বলেন, শৈশবের সময়টা সহজ ছিল না। যুদ্ধ আমাদের কাছ থেকে বহু জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছিল। তবে সেই রুঢ় বাস্তবতাই আমাকে শক্তভাবে গড়ে তুলেছে। কিন্তু আমি সেই দিনগুলোর কথা মনে করি না। তবে আমি তা পুরোপুরি ভুলেও যেতে পারি না।
এবার মদ্রিচের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের দিকে আলোকপাত করা যাক। মডরিচের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়টা একজন পেশাদার ফুটবলার হওয়ার এবং সফলতা পাওয়ার। এই পথযাত্রায় লম্বা স্বর্ণকেশীর সামনে অনেক প্রতিবন্ধকতা এলেও সব প্রতিকূলতাকে জয় করে মদ্রিচ নিজেকে তুলেন সেরাদের আসনে।

পেশাদার ফুটবলে মদ্রিচের শুরুটা হয় এনকে জাদারের হয়ে। জাদারের স্থানীয় এই ক্লাবটি থেকে মডরিচের পরবর্তী গন্তব্য হতে পারতো হাদজুক স্পিল্ট। বলে রাখা ভালো যে শৈশবে এটি ছিল লুকার প্রিয় দল। কিন্তু কম উচ্চতা, খর্বকায় শরীর আর লিকলিকে স্বাস্থ্যকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তারা লুকাকে দলে টানতে অস্বীকৃতি জানায়। ৮ বছর বয়সী এক শিশুর জন্য নিজের স্বপ্নের ক্লাব থেকে এমন প্রত্যাখ্যান মেনে নেওয়া কঠিনের চেয়েও বেশি কিছু ছিল বৈকি।
মদ্রিচের খারাপ লেগেছিলোও বটে, কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র তিনি নন। বরং সেটিকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বাড়িয়ে দিলেন অনুশীলন আর পরিশ্রমের মাত্রা। এনকে জাদারের হয়ে বয়সভিত্তিক ফুটবল খেলায় ততদিনে ক্লাবটির যুব একাডেমির প্রধান তোমিস্লাভ বাসিচের সুনজরে পড়ে যান লুকা। এই বাসিচের মাধ্যমেই পরবর্তীতে ক্রোয়েশিয়ার সফলতম দল ডায়নামো জাগরেবে পাড়ি জমান মডরিচ।
২০০১ সালে ডায়নামো জাগরেবে যোগদানের সময় মডরিচের বয়স ছিল মাত্র ১৬। ক্লাবের যুব দলের হয়ে এক মৌসুম খেললেও মূল দলে অভিষেকের জন্য তার অপেক্ষা বাড়ে। ২০০৩ সালে তাকে বসনিয়ার জ্রিঞ্জিস্কি মস্টারে ধারে পাঠানো হয়। বসনিয়ান ক্লাবটির হয়ে মাত্র এক মৌসুম খেললেও সেবারই দেশটির লিগের সেরা থেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন। পরের মৌসুমে আরেক স্বদেশি ক্লাব ইন্টার জাপ্রেসিচে খেলে ২০০৫ সালে ফিরে আসেন ডায়নামো জাগরেবে।
এরপর আর মদ্রিচকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৫ সালে ডায়নামো জাগরেবের মূল দলে শুধু মডরিচের অভিষেকই হয়নি, বরং ক্লাবের সঙ্গে করেন এক দশকের দীর্ঘ চুক্তি। যদিও ক্রোট ক্লাবটিতে খেলেন ২০০৮ সাল পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে দলকে এনে দেন টানা তিনটি লিগ শিরোপা। পাশাপাশি জেতান দুটি করে ঘরোয়া কাপ ও একটি সুপার কাপ। এ সময়ে ক্লাবের হয়ে ২৯টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করান ২১ গোল।
ডায়নামো জাগরেব থেকে মডরিচকে টানতে আগ্রহী ছিল অনেক ক্লাবই। বার্সেলোনা, চেলসি ও আর্সেনালই তুলনামূলক এগিয়ে ছিল। পাশাপাশি দৌড়ে ছিল ম্যানচেস্টার সিটি আর নিউক্যাসল ইউনাইটেডও। তবে সিলেবাসের বাইরে থেকে এসে বাজি মেরে দেয় টটেনহাম হটস্পার। সাড়ে ১৬ মিলিয়ন পাউন্ডে তাকে দলে ভেড়ায় লন্ডনভিত্তিক ক্লাবটি। ততদিনে মডরিচের নামের পাশে জুড়ে গেছে "বলকান ক্রুইফ" উপাধি। টটেনহামে এসে তাই মডরিচের গায়ে চাপলো ক্রুইফের আইকনিক ১৪ নম্বর জার্সি।

তবে শুরুর দিকে হাঁটুর চোট আর তৎকালীন কোচ হুয়ান্দে রামোসের পরিকল্পনায় খাপ খাওয়াতে না পারায় বেশ ভুগতে হয়েছিল মডরিচকে। এমনকি ইংলিশ ফুটবলের দ্রুতগতির সঙ্গে খর্বকায়-লিকলিকে লুকা তাল মেলাতে পারবেন নাকি সেটিও নিয়েও স্থানীয় গণমাধ্যম আর আর্সেন ওয়েঙ্গারের মতো ব্যক্তিত্বরা সন্দেহ প্রকাশ করলেন। মডরিচ যদিও সেসব সমালোচনাকে গায়ে মাখেননি, তথাপি টটেনহামে তার ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা রয়েই গেছিল।
কিন্তু সবকিছু পাল্টে গেল কোচের আসনে হ্যারি রেডন্যাপ আসার পর। তিনি এসেই পাল্টে দিলেন মডরিচের ভূমিকা, দিয়ে দিলেন মাঠের মধ্যভাগজুড়ে খেলার অবাধ স্বাধীনতা। ফলাফল- মডরিচ ফিরে পেলেন হারানো ছন্দ। টটেনহামও দীর্ঘ পাঁচ দশক পর ফিরলো চ্যাম্পিয়ন্স লিগে। শুধু তাই না, ২০১০-১১ মৌসুমে পা রেখেছিল ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের কুলীন প্রতিযোগিতার শেষ চারেও। চার বছরে টটেনহামের জার্সিতে ১৬০ ম্যাচ খেলে নিজে ১৭ বার জালে বল জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সতীর্থদের ২৪টি গোলে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন।
টটেনহামে থাকার সময়েই মডরিচের ওপর লন্ডনেরই আরেক ক্লাব চেলসির নজর ছিল। বেশ কয়েকবার ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডারকে নিজেদের ডেরায় আনতে চেয়েছিল ব্লুজরা। তাই যখন মডরিচের স্পার্স ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এলো, তখন ধারণা করা হচ্ছিল চেলসিই হবে লুকার পরবর্তী গন্তব্য। কিন্তু ইংলিশ পরাশক্তিদের সঙ্গে দৃশ্যপটে চলে আসে রিয়াল মাদ্রিদ। শেষ পর্যন্ত ৩০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ২০১২ সালের ২৭ আগস্ট স্প্যানিশ ক্লাবটিতে পাড়ি জমান ক্রোট মিডফিল্ডার।
রিয়ালে যোগদানের দুদিনের মাথায় দলের হয়ে বার্সেলোনার বিপক্ষে অভিষেক হয় মডরিচের। বলে রাখা ভালো, স্পেনের দলগুলোর মধ্যে বার্সাই ছিল তার প্রথম পছন্দ। আর সেই ক্লাবের বিরুদ্ধেই তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়ালের হয়ে স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতার মাধ্যমে সাদা জার্সিতে প্রথম শিরোপার স্বাদ পান মদ্রিচ।

কিন্তু শুরুটা ইতিবাচক হলেও মুদ্রার উল্টোপিঠ দেখতেও সময় লাগেনি মডরিচের। প্রাক-মৌসুমের অনুপস্থিতির কারণে দলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে একটু বেগই পেতে হচ্ছিল তার। উপরন্তু ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে জাবি আলোনসো-স্যামি খেদিরা আর এটাকিং মিডফিল্ডে উড়ন্ত ফর্মেন মেসুত ওজিল থাকায় রিয়ালের একাদশে কদাচিৎ জায়গা মিলতো ক্রোয়েশিয়ানের। বদলি হিসেবে নেমেও চোখে পড়ার মতো কিছু করতে পারছিলেন না। ফলে ২০১২ সালের শেষদিকে মডরিচের গায়ে মৌসুমের সবচেয়ে বাজে সাইনিংয়ের তকমা সেঁটে দিল মাদ্রিদভিত্তিক স্প্যানিশ দৈনিক মার্কা।
রিয়ালে লুকা মডরিচকে নিয়ে আসার মূল কারিগর ছিলেন ক্লাবটির তৎকালীন কোচ হোসে মরিনহোর। ঠোঁটকাটা স্বভাবের হলেও খাঁটি রত্ন চিনতে এ পর্তুগিজ কোচের জুড়ি মেলা ভার। মডরিচের সেই কঠিন সময়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে মরিনহো বলেছিলেন, মাদ্রিদিস্তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলব যে আপনারা ধৈর্য্য নিয়ে তাকে (মডরিচ) একটু সময় দিন। সে এতটাই ভালো যে এক সময় গোটা সান্তিয়াগো বার্নাব্যু তার প্রেমে পড়ে যাবে।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মডরিচের প্রথম মৌসুমের সবচেয়ে ভালো সময়টা ছিল ২০১৩ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহটা। ঘরের মাঠে লা লিগায় বার্সেলোনার বিরুদ্ধে কর্নার থেকে সার্জিও রামোসকে দিয়ে গোল করিয়ে এল ক্লাসিকোয় রিয়ালের জয়ে ভূমিকা রাখেন এই ক্রোয়েশিয়ান। তিন দিন পর থিয়েটার অব ড্রিমস খ্যাত ওল্ড ট্রাফোর্ডে ২৫ মিটার দূর থেকে গোল করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে পিছিয়ে থাকা রিয়ালকে জয়ের পথে সমতায় ফেরান। বলতে গেলে এউ দুটি ম্যাচেই মডরিচের রিয়াল মাদ্রিদ ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায়।

রিয়ালের হয়ে নিজের অভিষেক মৌসুমটা নতুন দেশের নয়া পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আর বিভিন্ন পজিশনে মানিয়ে নিতে নিতেই কাটান মডরিচ। সেবার কোনো সাফল্য না এলেও পরের মৌসুমে তিনি নিজেকে নতুন করে ফিরে পান। মরিনহোর প্রস্থানের পর কার্লো অ্যানচেলত্তি রিয়ালের কোচ হয়ে এলে একাদশে নিয়মিত জায়গা পেতে শুরু করেন মডরিচ। যদিও এর পেছনে ওজিল আর কাকার দল ছাড়ার ভূমিকাও ছিল।
তবে সে যাই হোক, সুযোগ পেয়ে মডরিচ নিজের জাত চেনাতে কোনো ভুল করেননি। নিখুঁত পাসিং আর প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে পরিণত হন রিয়াল মাদ্রিদের মাঝমাঠের নির্ভরযোগ্য সেনানীতে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের শেষ মুহূর্তে অধিনায়ক রামোসকে দিয়ে গোল করিয়ে রিয়ালের মৃতপ্রায় লা ডেসিমার স্বপ্নকে নতুন জীবন দেন। পরবর্তীতে এক যুগের অপেক্ষার পর লস ব্লাঙ্কোসরা পায় ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের স্বাদ। মডরিচ সেবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেরা একাদশে জায়গা পান। পাশাপাশি জিতে নেন লা লিগার বর্ষসেরা মিডফিল্ডারের স্বীকৃতি।
ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠা মডরিচের সাথে ২০১৪ সালে চার বছরের নতুন চুক্তি করে রিয়াল। আগের মৌসুমের দারুণ ছন্দটা সেবারও অব্যাহত ছিল ক্রোট মিডফিল্ডারের। কিন্তু দুই দফায় উরু আর হাঁটুর লিগামেন্টের চোটে তাকে মৌসুমের বড় একটা অংশই মাঠের বাইরে থাকতে হয়। লুকার অনুপস্থিতির ভুক্তভোগী হতে হয় রিয়ালকেও। টানা ২২ ম্যাচ জিতে শুরু করলেও স্প্যানিশ পরাশক্তিদের মৌসুমটা শেষ হয় শিরোপাহীনতার বেদনা নিয়ে।
পরের মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে আসেন তর্কসাপেক্ষে ফুটবল ইতিহাসের সেরা মিডফিল্ডার জিনেদিন জিদান। ফরাসি এই কিংবদন্তির আগমনে দলে মডরিচের গুরুত্ব বেড়ে গেল আরও অনেকখানি। লুকার সঙ্গে এ মৌসুমেই আগের বছরে দলে আসা টনি ক্রুস আর ধার থেকে ফেরা ক্যাসেমিরোকে সঙ্গে সিয়ে গঠিত হয় বিখ্যাত "কেসিএম" ত্রয়ী, যা সংজ্ঞায়িত করে রিয়ালের মাঝমাঠের একটি স্বর্ণালি সময়কে। মিডফিল্ডে এই ত্রয়ীর কর্তৃত্বের ওপর ভর করেই আধুনিক যুগের একমাত্র দল হিসেবে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে রিয়াল। পাশাপাশি মডরিচও ব্যক্তিগতভাবে লা লিগা ও উয়েফার বর্ষসেরা মিডফিল্ডারের পুরস্কার।

আধুনিক ফুটবলে লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা কারও অজানা থাকার কথা না। দুই জীবন্ত কিংবদন্তির অসামান্য ধারাবাহিকতার প্রতাপে অন্য কারও পক্ষে সেরার আসনে বসাটাও ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু ২০১৮ সালে মডরিচ সেই অসাধ্য সাধন করেন ব্যালন ডি অর এবং ফিফা বর্ষসেরার খেতাব বগলদাবা করার মাধ্যমে। মডরিচের অর্জনের মাহাত্ম্য বোঝা যাবে একটি তথ্যেই- মডরিচই হলেন মেসি এবং রোনালদো ব্যতিত ২০০৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ব্যালন ডি অর জেতা একমাত্র ফুটবলার।
পাশাপাশি জিতে নেন উয়েফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও। ক্রোয়েশিয়ার প্রথম এবং একমাত্র ফুটবলার হিসেবে এসব স্বীকৃতি পান এই মিডফিল্ডার।এরপর সময় যত এগিয়েছে, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে নিজের সাফল্য আর অর্জনের পাল্লা আরও ভারী করেছেন মডরিচ। ২০২২ আর ২০২৪ সালে প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয় আরও দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। এর মাধ্যমে সতীর্থ ক্রুস, নাচো ফার্নান্দেজ, দানি কার্ভাহাল ও প্রয়াত ফ্রান্সিস্কো গেন্তোর সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের সাদ পান লুকা। সেই সঙ্গে জিতে নেন আরও তিনটি লা লিগা। প্রতিটি শিরোপাতেই সামনে থেকে বড় ভূমিকা রাখেন সোনালী চুলের এ ক্রোট। পাশাপাশি এর মধ্যে পেয়েছেন স্প্যানিশ ক্লাবটির অধিনায়কত্বের বাহুবন্ধনীও।
বয়স যত বেড়েছে মডরিচ যেন ততই আরও ওয়াইনের মতো পরিশুদ্ধ হয়েছেন। চল্লিশের দোরগোড়ায় এসেও ক্রোয়েশিয়ান এ মিডফিল্ডারের ধার কমেনি মোটেও। বরং প্রতিনিয়তই বুড়ো হাড়ের ভেলকিতে মাতিয়েছেন মাদ্রিদিস্তা ও ফুটবলপ্রেমীদের। সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ মৌসুমে তো দুই দফা রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ডে নিজের নাম লিখিয়েছেন লুকা।
২৬ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদে পা রাখা মডরিচ ত্রিশের কোঠা পেরিয়েছেন বহু আগেই। স্প্যানিশ পরাশক্তিদের সাথে দুই দফা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নবায়নও ততদিনে সম্পন্ন। ত্রিশোর্ধ্ব ফুটবলারদের ক্ষেত্রে বরাবরই বছর বছর ধরে চুক্তি নবায়ন করে থাকে রিয়াল। ব্যতিক্রম হয়নি লুকার ক্ষেত্রেও। সবুজ গালিচায় আলো ছড়ানোর মাধ্যমে বেতন কমিয়ে হলেও প্রতি বছরই রিয়ালের হয়ে চুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছিলেন পোড় খাওয়া এ ক্রোয়েশিয়ান।
সময় যত এগিয়েছে ততই রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে অমরত্ব নিশ্চিত করেছেন মডরিচ। নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারের অবসরটাও হয়তো এখানেই নিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্লাব কর্তৃপক্ষের অপরাগতায় ছেদ পড়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ আর লুকা মডরিচের দীর্ঘদিনের এক সম্পর্কের। গত ২৪ মে লা লিগায় রিয়াল সোসিয়েদাদের বিপক্ষে ৮০ লাখেরও বেশি সমর্থক ঘরের মাঠ সান্তিয়োগে বার্নাব্যুতে মডরিচকে বিদায় জানায়। তবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মডরিচ অংশ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় সদ্য সমাপ্ত ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও। যদিও প্রতিযোগিতাটিতে প্রতিটি ম্যাচেই বদলি হিসেবে মাঠে নামেন এ ক্রোয়েশিয়ান। সেমিফাইনালে সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী পিএসজির কাছে ০-৪ গোলে বিধ্বস্ত হয় স্প্যানিশ ক্লাবটি। সেই সঙ্গে থেমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মডরিচের দীর্ঘ ১৩ বছরের পথচলার।
রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ৫৯৭ ম্যাচ খেলে ৪৩টি গোলের সঙ্গে ৯৫টি গোলে সরাসরি অবদান রাখেন। সেই সঙ্গে সফেদ জার্সিতে ৪টি লা লিগা, ৬টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ২টি কোপা দেল রে জেতেন। সেই সঙ্গে ৫টি করে উয়েফা সুপার কাপ, সুপার কোপা ডে এস্পানা, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ ও একটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জেতেন। সব মিলিয়ে স্প্যানিশ পরাশক্তিটির হয়ে মডরিচ পেয়েছেন ২৮টি শিরোপার স্বাদ। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার চেয়ে বেশি শিরোপা আর কেউ জেতেননি।
তবে একজন মডরিচের মাহাত্ম্য বোঝানোর সাধ্য এসব বেরসিক সংখ্যাগুলোর নেই। স্বর্ণকেশী এই ক্রোট মিডফিল্ডার যে বহু আগেই পরিসংখ্যানের উর্ধ্বে চলে গেছেন। মাঝমাঠ থেকে খেলার নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে স্কোরশিটে মডরিচের নাম খুব একটা নাম দেখা যেতো না। তবে যখনই গোলদাতার তালিকায় লুকার নাম উঠতো, তখন অজান্তেই সবার চোখ বিমোহিত হতো। ডি-বক্সের বাইরে থেকে গোল করাকে বানিয়ে ফেলেছিলেন অভ্যাসের মতো। পাশাপাশি ট্রিভেলা পাসের মাধ্যমে সতীর্থদের গোল করানোকে নিয়ে গেছিলেন শিল্পের পর্যায়ে।

আর মাঠের খেলা? সেদিকে তো মডরিচ ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে! মূলত সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হলেও এই ক্রোয়েশিয়ান কখনো নিজেকে মাঠের মধ্যভাগের নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। একাধারে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড, হোল্ডিং মিডফিল্ড, ওয়াইড মিডফিল্ডার, ডিপ লায়িং প্লেমেকার ও এটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন। তাছাড়া প্রতিপক্ষের ডি-বক্স ও নিজেদের রক্ষণভাগেও ছিল তার সমান বিচরণ।
রিয়াল মাদ্রিদের দীর্ঘ অধ্যায় শেষে ইতোমধ্যেই এসি মিলানে পাড়ি জমিয়েছেন মডরিচ। রোজোনারি শিবিরে যোগদানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও নিজের বায়ো থেকে রিয়াল মাদ্রিদের নাম সরিয়ে দিয়েছেন ক্রোট মিডফিল্ডার। কিন্তু তাতে লস ব্লাঙ্কোসদের হয়ে লুকার গড়া ইতিহাস মুছার নয়। লুকা থাকবেন লিসবনে লা ডেসিমা এনে দেওয়া রামোসের হেডে; লুকা থাকবেন ওল্ড ট্রাফোর্ডে নাক উঁচু ব্রিটিশদের অহংবোধে আঘাত হানা দুরপাল্লার কিকে, লুকা থাকবেন পড়ন্ত বেলায় তিন ডিফেন্ডারকে ছিটকে পিএসজির পেট্রোডলারের ঝনঝনানি থামিয়ে দেওয়া সেই সলো রানে; লুকা থাকবেন ছেলের বয়সী রদ্রিগোকে বাড়িয়ে দেওয়া ট্রিভেলা এসিস্টে। এক কথায় লুকা থাকবেন রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে, যেখানে তিনি শুধু একটি পৃষ্ঠা ননন বরং পুরোদস্তুর এক অধ্যায়। যে অধ্যায় লেখা হয়েছে মডরিচের সোনালী চুলের হরফে আর মোড়ানো হয়েছে তার নিখাদ শিল্পকর্মে।
আরটিভি/এসকে




