টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও শিরোপার দেখা না পাওয়ায় ব্রাজিলের ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। নরওয়ের কাছে শেষ ষোলো থেকে বিদায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। সেই আলোচনার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, অনেক সমর্থকই জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা হারাতে শুরু করেছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান অরবিট ডাটা সায়েন্সের এক সমীক্ষা বলছে, আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্রাজিলিয়ানদের ৪১ শতাংশের বিশ্বাস, ব্রাজিল আর কখনোই বিশ্বকাপ জিততে পারবে না।
সমীক্ষার জন্য গত ২০ এপ্রিল থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে প্রকাশিত ৭ হাজার ৮৫৫টি উন্মুক্ত পোস্ট ও মন্তব্য বিশ্লেষণ করা হয়। এর বেশির ভাগই সংগ্রহ করা হয়েছে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর, যখন সমর্থকদের আবেগ ও প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে তীব্র ছিল।
জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে হওয়া আলোচনায় হতাশাবাদী মনোভাবই ছিল প্রাধান্য। বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট মন্তব্যের ৫৪ শতাংশে হতাশা প্রকাশ পেয়েছে, বিপরীতে আশাবাদী মন্তব্য ছিল ৪৬ শতাংশ। হতাশাবাদীদের মধ্যে ৪১ শতাংশ সরাসরি বলেছেন, ব্রাজিল আর কোনো দিন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে না। আবার ১৩ শতাংশের আশঙ্কা, তাদের জীবদ্দশায়ও হয়তো সেলেসাওদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয় দেখা হবে না।
সবচেয়ে বেশি হতাশা প্রকাশ পেয়েছে শেষ ষোলো থেকে বিদায়ের পর। পরাজয় নিয়ে করা নেতিবাচক পোস্টগুলোর ৬৩ শতাংশেই নরওয়ের বিপক্ষে হারের আক্ষেপ উঠে এসেছে। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে সমর্থকদের অনেকেই এরপর দলের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে শুরু করেন। প্রত্যাশার তুলনায় বাজে পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা ছিল নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ১২ শতাংশে। দলগত সমন্বয়ের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে আরও ৫ শতাংশ মন্তব্যে।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর আলোচনার অন্যতম বড় বিষয় হয়ে ওঠে পেনাল্টি শুটআউট। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র শট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। মোট আলোচনার ৫ শতাংশে এই ঘটনাটি উঠে আসে এবং অনেকের কাছে এটি ব্রাজিলের বিদায়ের প্রতীকী মুহূর্তে পরিণত হয়। সমালোচনা অবশ্য কেবল একটি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পুরো টুর্নামেন্টে দলের পারফরম্যান্স এবং খেলোয়াড়দের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সমর্থকেরা। নেতিবাচক মন্তব্যের ২৩ শতাংশ ছিল খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ঘিরে, আর পুরো বিশ্বকাপে দলের সামগ্রিক নৈপুণ্য নিয়ে ছিল ২০ শতাংশ সমালোচনা।
ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন লুকাস পাকেতা। খেলোয়াড়দের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের ১৯ শতাংশই ছিল তাকে ঘিরে। নরওয়ের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি মিস করা ব্রুনো গুইমারেস ছিলেন দ্বিতীয় সর্বাধিক সমালোচিত ফুটবলার, যাকে নিয়ে ছিল ৭ শতাংশ নেতিবাচক মন্তব্য। সমর্থকদের ক্ষোভের বাইরে থাকেননি প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তিও। মোট সমালোচনার ১২ শতাংশে তাঁর বিদায়ের দাবি ওঠে। পাশাপাশি দলের অঙ্গীকারের অভাব এবং ব্রাজিলের মতো ফুটবল ঐতিহ্যের দেশের জাতীয় দলের দায়িত্বে একজন বিদেশি কোচকে নিয়োগ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক সমর্থক।
তবে হতাশার মধ্যেও নতুন প্রজন্মকে ঘিরে আশার আলো দেখছেন ব্রাজিলিয়ানরা। এই বিশ্বকাপের পর নেইমারকে আর জাতীয় দলের ভবিষ্যতের প্রধান ভরসা হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। বরং ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় আশা হয়ে উঠেছেন তরুণ ফরোয়ার্ড এনদ্রিক। খেলোয়াড়দের নিয়ে হওয়া আলোচনার ৩২ শতাংশে নেইমারের জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্যের ১৯ শতাংশই ছিল এনদ্রিককে ঘিরে। গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র দুজনেরই নাম এসেছে ১১ শতাংশ ইতিবাচক আলোচনায়। তাদেরও আগামী দিনের ব্রাজিল দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে দেখছেন সমর্থকেরা।
অরবিট ডাটা সায়েন্সের গবেষণা সমন্বয়ক ক্যারোলিনা ভালে বলেন, বিশ্বকাপ শেষে প্রতীকী অর্থে এনদ্রিক, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও মার্তিনেল্লি বিশাল গুরুত্ব পেয়েছেন। টুর্নামেন্টজুড়ে সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে বদলেছে এবং শেষ পর্যন্ত এই তিনজনকেই ব্রাজিল ফুটবলের নতুন যুগের প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন তারা।
যারা এখনো আশাবাদী, তাদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রত্যাশা রয়েছে। আশাবাদী পোস্টের ১৭ শতাংশে ২০৩০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের আশা প্রকাশ করা হয়েছে। আবার ১৬ শতাংশের বিশ্বাস, ২০২৭ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য নারী বিশ্বকাপ জাতীয় ফুটবলকে ঘিরে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর নতুন যাত্রার ইতিবাচক সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন ১৩ শতাংশ সমর্থক।
সমীক্ষায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় উঠে এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অংশগ্রহণের হার নিয়ে। প্রস্তুতি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কোনো ম্যাচের দিনই এত কম আলোচনা হয়নি, যতটা হয়েছে নরওয়ের বিপক্ষে হারের দিন। অরবিটের বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই অনেক সমর্থক ব্রাজিলের বিদায় মেনে নিয়েছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কাইও সিমির ভাষায়, এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মধ্যে হতাশা ও আশা একই সঙ্গে জন্ম নিয়েছে। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের ধাক্কা থাকলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আবার ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে শুরু করেছে। তার মতে, এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় প্রভাব শুধু শেষ ষোলো থেকে বিদায় নয়, বরং ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মানসিকতায় ঘটে যাওয়া পরিবর্তন। ৯৫ শতাংশ নির্ভরযোগ্যতার মাত্রা এবং ৩ শতাংশ ত্রুটির সীমা ধরে পরিচালিত এই সমীক্ষায় ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে ব্রাজিলিয়ানদের প্রকাশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আরটিভি/এআর



