গুড় হিসেবে খাচ্ছি গরুর চর্বি ও কাপড়ের রঙ (ভিডিও)

সাভার প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২২ , ১০:৩২ পিএম


সাভারের নামাবাজারে আখ ও খেজুরের রসের পরিবর্তে গরুর চর্বি, গো-খাদ্যনালি, চিনি, আটা, কাপড়ের রঙ দিয়েই তৈরি হচ্ছে গুড়। মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর এসব গুড় খেয়ে ক্রমাগত স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে চলছে ভোক্তাদের। তবে এসব গুড় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে শিশুদের। 

সারা বছর কমবেশি এসব গুড় আমরা খেলেও শীতের সময়টিতে এবং বিশেষ দিনে এসব গুড় দিয়েই চলে আমাদের পিঠা-পুলির উৎসব। সচেতন মহল এসব নিয়ে প্রশ্ন তুললেও প্রশাসনের সঠিক নজরদারির অভাব ও নীরবতার কারণে সাভার নামাবাজারে কারখানাগুলোতে বছরের পর বছর চলে ভেজাল গুড় তৈরির রমরমা কারবার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাভারের নামাবাজারের রুপা এন্টারপ্রাইজের মালিক গৌতম সাহা ও শংকর পালের রয়েছে বিশাল ভেজাল গুড় তৈরির কারখানা। মূলত এদের মধ্যে গৌতম সাহা সিন্ডিকেট তৈরি করে। গরুর চর্বি, গো-খাদ্যনালি, চিনি, আটা, কাপড়ের রঙ দিয়েই তৈরি করছেন গুড়। রাতের আঁধারে চলে এসব গুড় তৈরি, আবার দিনের আলো হওয়ার আগেই সেসব গুড় ট্রাক বোঝাই হয়ে চলে যায় দেশের প্রত্যন্ত এলাকার বাজারগুলোতে। আর গৌতম সাহার ভেজাল গুড় তৈরির এসব খবর সাভার বাজারের অন্যান্য খুচরা গুড় ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের জানা থাকলেও প্রভাবশালী হওয়ায় নীরব থাকেন তারাও। 

সাভার বাজার লোকনাথ গুড় ভান্ডারের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা খেজুরের গুড় ও আখের গুড় রাজশাহী-খোকসা থেকে কিনে এনে সাভার বাজারে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করেন। সাভার বাজারেও তো গুড় তৈরির বিশাল কারখানা আছে। অথচ আপনারা অন্যত্র থেকে গুড় কিনে এনে ব্যবসা করছেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, আমরা তাদের গুড় ক্রয় করি না। তাদের আলাদা পাইকার আছে তারাও বিভিন্ন জেলায় গুড় পাঠায়।
 
সাভার বাজারের একাধিক খুচরা গুড় বিক্রেতা অভিযোগ করে বলেন, ওরা তো গরুর চর্বি, গো-খাদ্যনালি, চিনি, আটা, কাপড়ের রঙ দিয়ে গুড় তৈরি করে। তাদের গুড় আমরা কেউ বিক্রি করি না। ওদের জন্য বাজারে বদনাম হয় আমাদের। কিন্তু প্রভাবশালী হওয়ায় আমরা কেউ কিছু বলতে পারি না।
 
দেখা গেছে, সাভার বাজারে আখের গুড় ১০০ টাকা, খেজুরের গুড় ১০০ টাকা থেকে ১২০টাকা, ঝোলা গুড় ১৪০টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। 
 
এদিকে রাতের আঁধারে সাভার পৌর-এলাকার নামাবাজারে রুপা এন্টারপ্রাইজের মালিক গৌতম সাহার গুড় তৈরির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, কারখানার অনেকটাই ভুতুড়ে আর নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। গুড় তৈরি হচ্ছে গরুর চর্বি, চিনি, আটা, কাপড়ের রঙ মিশিয়ে। জ্বলন্ত লাকড়ির চুলার ওপর বিশাল কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে চিনি আর গো-খাদ্যনালি, পাশের বিশাল বিশাল ট্রেতে কাপড়ের রঙ ও গরুর চর্বির সংমিশ্রণ। গুড়ের রঙ ঠিক রাখতে মেশানো হয় কাপড়ের রঙ, এছাড়া গুড়কে ঘন ও জমাট করতে ড্রামে আটার কাই মেশানো হয়। সঙ্গে মেশানো হয় গরুর চর্বি আর মিষ্টির জন্য চিনির সিরাপ সাথে গো-খাদ্যনালি তো আছেই। ব্যস হয়ে গেল গুড়। তারপর টিনের কিংবা মাটির কলস ভর্তি হচ্ছে গুড়। সারারাত চলে এমন কর্মযজ্ঞ। 

সরেজমিনে কারখানায় গেলে আমাদের প্রশাসনের লোক ভেবে প্রথমে কারখানার কারিগররা সটকে পড়ে। পরে সাংবাদিক বুঝতে পেরে গুড়ের পক্ষে সাফাই গাইতে চলে আসেন প্রভাবশালী ধুরন্ধর রুপা এন্টারপ্রাইজ মালিক গৌতম সাহা ও তার এক সহচর। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিরাতে সাভার নামাবাজরে গৌতম সাহার গুড় কারখানায় দেড় থেকে ২ টন গুড় তৈরি হয়। এসব গুড় রাতের আঁধারে চলে যায় দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় জেলা শহরে। এছাড়া বাজারের ভিতর রয়েছে বিশাল বিশাল গোড়াউন। 
   
২০২০ সালের ২৩ জুলাই সাভার নামাবাজার এলাকায় রুপা এন্টারপ্রাইজের মালিক গৌতম সাহার গুড় কারখানায় অভিযান চালান র‍্যাব-৪ এর ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান। এবারও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিম্নমানের চিনি, ফিটকিরি ও কেমিক্যাল ব্যবহার করে গুড় তৈরি করার দায়ে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল জব্দ এবং ৪ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৩ মাসের জেল কারাদণ্ড দেওয়া হয়। 

সেই রুপা এন্টারপ্রাইজের গৌতম সাহা এখন ফুলে-ফেঁপে বেড়েছেন, ব্যবসা হয়েছে বড়, বিশাল বিশাল করখানায় প্রতিরাতে টনটন গুড় তৈরি করছেন। 

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সায়েমুল হুদা বলেন, লিভার থেকে ধরে মানব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে এসব ভেজাল গুড়। মানবদেহের বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এসব গুড়।

সাভার নামাবাজারে ভেজাল গুড় তৈরির কারখানার বিষয়ে অবগত না হলেও সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাজহারুল ইসলাম আরটিভি নিউজকে বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভেজাল মিশ্রণের মাধ্যমে গুড় তৈরির বিষয়ে নিরাপদ খাদ্য আইনের ২০১৩ এর ২৩ ধারায়, ২৪ ধারায়, ২৫ ধারায় ও ৩৩ ধারায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৪২ ও ৪৩ ধারায় এই ভেজালের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন অর্থাৎ যে গুড় তৈরি করা হচ্ছে এ বিষয়ে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে আইন রয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শন করে এর সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমআই/এসকে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission