প্রকাশ্যেই জমিদার বাড়ির ‘পুকুর খুঁড়ে’ নেওয়া হচ্ছে গুপ্তধন

সদরপুর (ফরিদপুর) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ , ০২:৫২ পিএম


প্রকাশ্যেই জমিদার বাড়ির ‘পুকুর খুঁড়ে’ নেওয়া হচ্ছে গুপ্তধন
পুকুরের বউঘাট খুঁড়ে তোলা হয় প্রত্নসম্পদ : ছবি আরটিভি

গুপ্তধনের আশায় ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ২০০ বছরের পুরোনো বাইশরশি জমিদার বাড়ির একটি পুকুরের ‘বউঘাট’ (নারীদের স্নানের স্থান) খুঁড়ে তছনছ করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, একটি অসাধু চক্র প্রকাশ্যেই সেখানে খনন চালিয়ে মূল্যবান প্রত্নসম্পদ তুলে নিচ্ছে।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বউঘাটের নিচের অংশে খনন করে মাটি তুলে নেওয়া হয়েছে। খননের স্থানে পাথরের মূর্তির ভাঙা অংশ পড়ে আছে। এছাড়া জমিদারদের ব্যবহৃত কালো পাথরের বাটি, ধুপকাটির পাত্র, পূজার ঘোটি, দোয়াতকালির পাত্রসহ বিভিন্ন তৈজসপত্রের ভাঙা অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। 

jmd2

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দিনের বেলাতেই কয়েক ব্যক্তি মাটি তুলে পাশের পুকুরে নিয়ে ধুয়ে সেখান থেকে মূল্যবান সামগ্রী সংগ্রহ করছে। তাদের হাতে স্বর্ণালংকার, পাথরের দাবার গুটি, বল, তামা ও রুপার মুদ্রাসহ বিভিন্ন পুরোনো জিনিসপত্র উদ্ধার হতে দেখা গেছে। পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলা থেকে আসা বলে দাবি করেন।

স্থানীয়রা জানান, একসময় এই জমিদার পরিবার ফরিদপুর, বরিশালসহ ২২টি পরগনার অধিপতি ছিল। জমিদার প্রথা থাকা পর্যন্ত এই অঞ্চলে তারা জমিদারি করেছেন এবং দেশ ভাগের পর এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। তার পর থেকে এ বাড়িটি সরকারি তত্বাবধানে রয়েছে। এ পরিত্যক্ত বাড়ির যে স্থানে খনন করা হচ্ছে, সেখানে জমিদার বাড়ির নারীরা স্নান করতেন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হতো। ধারণা করা হয়, স্নানের সময় হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান রত্নের আশায়ই চক্রটি সেখানে খনন করছে।

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত আনজুম পিয়া বলেন, খননের বিষয়টি জেনেছি। দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ১৭শ শতকের গোড়ার দিকে লবণ ব্যবসার মাধ্যমে সাহা পরিবার বিপুল সম্পদের মালিক হয়। পরবর্তীতে তারা একে একে ২২টি পরগনা ক্রয় করে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করে। ১৮শ শতক থেকে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত ভারতবর্ষজুড়ে এই পরিবারের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি ছিল সুপরিচিত।

একসময় প্রায় ৫০ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই জমিদার বাড়িতে ছিল বাগানবাড়ি, শানবাঁধানো পুকুর, পূজামণ্ডপ এবং দ্বিতলবিশিষ্ট ছোট-বড় ১৪টি দালানকোঠা। বর্তমানে প্রায় ৩০ একর জমি টিকে থাকলেও বাকি অংশ দখল হয়ে গেছে। এখনো কারুকার্যখচিত দরজা-জানালা ও লোহার অলংকরণে অতীতের আভিজাত্যের ছাপ মিললেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

jmdr3

বর্তমানে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। মূল্যবান কাঠের দরজা, লোহার কারুকাজ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একের পর এক লুট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

স্থানীয়রা জানান, রাতের বেলায় জায়গাটি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, এমনকি দিনের বেলাতেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

উল্লেখ্য, জমিদার বাড়ির ভেতরে উপজেলা ভূমি অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, ফায়ারসার্ভিস ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও স্থাপনাটির নিরাপত্তা ও সংরক্ষণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। 

স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ঐতিহাসিক এই নিদর্শন রক্ষা করা হোক।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission